হ্রদ-পাহাড়ের রাঙামাটি

এখানে পাহাড়ের কোল ঘেঁষে ঘুমিয়ে থাকে শান্ত জলের হ্রদ। নীল আকাশ মিতালি করে সেই হ্রদের সাথে। পাহাড়, নদী আর হ্রদের মিলনমেলা দেখতে চাইলে ঘুরে আসতে পারেন রাঙামাটি থেকে। রাঙামাটিতে রয়েছে অনেকগুলো দর্শনীয় স্থান। এর মধ্যে কাপ্তাই হ্রদ, পর্যটন মোটেল, ডিসি বাংলো, ঝুলন্ত ব্রিজ, সাজেক, পেদা টিংটিং, সুবলং ঝর্ণা, রাজবাড়ি, রাজবন বিহার, উপজাতীয় জাদুঘর, কাপ্তাই হাইড্রো ইলেক্ট্রিক প্রজেক্ট, কাপ্তাই জাতীয় উদ্যান ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

সাজেক
সকাল-সন্ধ্যা প্রায় সময়ই পাহাড়ে মেঘের খেলা সাজেকের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। যেদিকে চোখ যাবে, শুধু মেঘ আর রংয়ের খেলা। সর্বোচ্চ চূড়া থেকে নিচে দূরের গ্রামের দিকে তাকালে মনে হবে পটে আঁকা আধুনিক কোনো ছোট্ট শহর! সাজেকে বিদ্যুৎ নেই ঠিকই, তবে আছে সোডিয়াম লাইট, বায়ো-বিদ্যুৎ। মসৃণ সড়ক, মানের হোটেল, রিসোর্ট, ক্লাবও গড়ে উঠেছে। আর সে কারণেই প্রাকৃতিক নিসর্গে সাজানো সাজেক এখন পর্যটকদের হাতছানি দিয়ে ডাকে। পর্যটনবান্ধব সাজেক প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ অবদান। এক সময়ের দুর্গম সাজেকে এখন রাতের চিত্রও ভিন্ন। রুইলুইপাড়াতে রাতে জ্বলছে সোডিয়াম বাতি, তাও আবার স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতির সোলার সিস্টেমের মাধ্যমে। সকালে ঘুম থেকে উঠে চোখ মেলে তাকালেই মনে হবে, মেঘের চাদর ঢেকে রেখেছে সাজেককে। সাজেকে যেতে হলে খাগড়াছড়ি জেলার ওপর দিয়ে যেতে হবে। খাগড়াছড়ি থেকে দীঘিনালা যাওয়ার পর সেখান থেকে মোটর সাইকেল কিংবা চান্দের গাড়িতে সাজেক যাওয়া যাবে।

কাপ্তাই হ্রদ
পার্বত্য এই জেলার দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে কাপ্তাই হ্রদ অন্যতম। ষাটের দশকে কর্ণফুলীর খরস্রোতা পানিতে বাঁধ নির্মাণের ফলে সৃষ্টি হয়েছে দেশের সবচে বড় কৃত্রিম হ্রদ। মূলত পানি বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য এই বাঁধ নির্মিত হয়। অসংখ্য পাহাড়ের কোল ঘেঁষে বয়ে চলা আঁকাবাঁকা বিশাল কাপ্তাই হ্রদে ঘুরতে পারেন নৌকা নিয়ে। সারাদিন কাপ্তাই হ্রদে ভ্রমণের জন্য একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকার ভাড়া পড়বে ১৫০০-২৫০০ টাকা। সাথে লাইফ জ্যাকেটটা নিতে ভুলবেন না।

রাঙামাটি পর্যটন মোটেল ও ঝুলন্ত সেতু
রাঙামাটি শহরের শেষ প্রান্তে হ্রদের ওপর গড়ে উঠেছে পর্যটনকেন্দ্র। পর্যটন মোটেল পার হলেই ঝুলন্ত সেতু। ঝুলন্ত সেতুতে দাঁড়ালেই চোখে পড়ে দৃশ্যমান লেকের অবারিত জলরাশি ও দূরের উঁচু-নিচু পাহাড়ের আকাশছোঁয়া বৃক্ষরাজি। এখানে রয়েছে কটেজ, পার্ক, পিকনিট স্পট, স্পিড বোট ও সাম্পানের মতো দেখতে নৌযান।

রাজবন বিহার
পর্যটকদের জন্য অন্যতম আকর্ষণীয় তীর্থস্থান রাঙামাটির ঐতিহ্যবাহী রাজবন বিহার। চাকমারা অবশ্য বিহার বা মন্দিরকে কিয়াং বলে থাকে। এটি বাংলাদেশের একটি প্রধান বৌদ্ধবিহার। ৩৩ দশমিক ৫ একর এলাকায় ৪টি মন্দির, ভিক্ষুদের ভাবনাকেন্দ্র, বেইনঘর, তাবতিংশ স্বর্গ, বিশ্রামাগার ও হাসপাতাল রয়েছে এতে।

সুবলং জলপ্রপাত
সুবলং ঝর্ণার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অপূর্ব নৈসর্গিক সৃষ্টি। এটি রাঙামাটির বরকল উপজেলায় অবস্থিত। সুবলং ঝরণা ৩০০ ফুট উঁচু। বর্ষাকালে নবযৌবন ফিরে পায় ঝর্ণা।

টুকটুক ইকো ভিলেজ
হ্রদে দীর্ঘ ভ্রমণে ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত অতিথির জন্য রয়েছে বেশ কয়েকটি পাহাড়ি রেস্তোরাঁয় রকমারি খাবারের স্বাদ। কাঠ এবং বাঁশের কারুকাজে তৈরি এসব রেস্তোরাঁয় দেশীয় ও পাহাড়ি মজাদার সব খাবার-দাবার পাওয়া যাবে। ৫০ একর জায়গা জুড়ে বহু টিলা-উপটিলায় পুরো ইকো ভিলেজটিতে সুদৃশ্য বেশ কয়েকটি কাঠের কটেজ। জানালার ফাঁক গলিয়ে দূরে পাহাড়ের ঢালে কাপ্তাইয়ের পানিতে চাঁদের প্রতিচ্ছবি অসাধারণ। রাতগভীরে বন-বনানী থেকে ভেসে আসা ঝিঁঝি পোকা, নাম জানা-অজানা নিশাচর পশু-পাখির বিচিত্র ডাকে অজানা রাজ্য এসে সামনে দাঁড়ায়। আছে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা।

বালুখালী
রাঙামাটি শহরের কাছেই বালুখালী কৃষি খামার। খামারের বিশাল এলাকা জুড়ে যে উদ্যান রয়েছে, তা চমৎকার। এখানে প্রায় সময় দলবেঁধে লোকজন পিকনিক করতে আসে। খামারটিতে ফল-ফুলসহ অসংখ্য প্রজাতির গাছগাছালি রয়েছে। রাঙামাটি শহর থেকে স্পিডবোট ভাড়া করে এখানে আসা যায়। ভাড়া দেড় থেকে আড়াই হাজার টাকা। তবে দেশীয় ইঞ্জিন বোটে ভাড়া ৮০০ থেকে হাজার টাকা।

ফুরোমোন
শহরের অল্প দূরে অবস্থিত ফুরামোন পাহাড়। এ পাহাড়ের চূড়ায় উঠে রাঙামাটি শহরের অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। এর উচ্চতা এক হাজার ৫১৮ ফুট। ফুরামোন পাহাড় যেতে হলে শহরের মানিকছড়ির সাপছড়ি হয়ে যেতে হবে। এখানে রাজবন বিহারের ফুরামোনা শাখা নামে বৌদ্ধদের একটি মন্দির রয়েছে। অটোরিকশা ভাড়া করে সাপছড়ি পর্যন্ত গিয়ে এরপর হেঁটে যেতে হবে। এ জন্য অবশ্যই পাহাড়ে ওঠার অভ্যাস থাকতে হবে। আরেকটু আরামে যেতে চাইলে ফুরামোনের পাদদেশে নির্মিত রাস্তা দিয়েও যেতে পারেন। তবে ফুরামোন পাহাড়ে যাওয়ার আগে নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। কারণ এলাকাটি খুবই নির্জন।

মোনঘর ও সুখী নীলগঞ্জ
রাঙামাটি শহর থেকে মাত্র পাঁচ কিলোমিটার দূরে রাঙাপানি এলাকায় চার একর পাহাড়ের উপর অবস্থিত মোনঘর শিশু সদন। প্রতিষ্ঠানটি স্থানীয় লোকজনের কাছে পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি নিকেতন হিসেবে পরিচিত। ১৯৭৪ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামের অনাথ ও দুস্থ শিশুদের আশ্রয় দিয়ে পড়ালেখার জন্য এটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। মোনঘর শব্দের অর্থ পাহাড়ে জুম চাষের জন্য চাষিদের থাকার অস্থায়ী আশ্রয়স্থল। যতদিন পর্যন্ত না চাষিরা জুমের ধানের বীজ থেকে অন্যান্য ফলন মোনঘরে তুলতে পারবেন ততদিন পর্যন্ত সেখানে থেকে কাজ চালিয়ে যাবেন। দুস্থ ও অনাথ শিশুদের আশ্রয় দেওয়া মোনঘর শিশু সদনের কাজ। গাছপালা ঘেরা ভবন, বৌদ্ধ মন্দিরসহ দেখার অনেক কিছু রয়েছে এখানে। তবে মোনঘর শিশু সদনের ভেতরে যেতে চাইলে আগে কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হবে। শহর থেকে অটোরিকশা ভাড়া করে এখানে আসা যাবে। হাতে সময় থাকলে এখান থেকে স্বল্প দূরত্বের হ্যাচারি ঘাট এলাকায় সবুজ বৃক্ষরাশি ঘেরা পুলিশ লাইনের সুখী নীলগঞ্জ, রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের তত্ত্বাবধানে নির্মিত বোটানিক্যাল গার্ডেন ও মিনি চিড়িয়াখানাও ঘুরে আসতে পারেন।

ডিসি বাংলো
রাঙামাটি শহরের জিরো পয়েন্টে কর্ণফুলী হ্রদের গা ঘেঁষে রাঙামাটি জেলা প্রশাসকের বাংলো। সংযোগ সড়ক ছাড়া বাংলোর তিনদিকেই ঘিরে রেখেছে হ্রদের বিস্তীর্ণ জলরাশি। বাংলোর পাশে ছোট টিলার উপরে রয়েছে একটি বাতিঘর ও কোচপানা নামক ছাউনি, যা সেতু দ্বারা বাংলোর সাথে সংযুক্ত। সেতু এবং ছাউনি থেকে পর্যটক ও দর্শনার্থীরা হ্রদ দেখতে পাবেন। রাঙামাটি শহরের যেকোনও স্থান থেকে অটোরিক্সাতেও এখানে আসা যায়। তবে বাংলো এলাকায় প্রবেশের জন্য অনুমতি আবশ্যক।

উপজাতীয় যাদুঘর
রাঙামাটির প্রবেশ দ্বারেই দৃষ্টি কাড়ে উপজাতীয় যাদুঘর। ১৯৭৮ সালে যাত্রা শুরু এটির। ২০০৩ সালে নতুন ভবন নির্মিত হলে তা আরো সমৃদ্ধ হয়। এ যাদুঘরে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত জাতিসত্তাসমূহের ঐতিহ্যবাহী অলংকার, পোশাক-পরিচ্ছদ, বাদ্যযন্ত্র, ব্যবহার্য তৈজসপত্র, অস্ত্র, প্রাচীন মুদ্রা, প্রাচীন ধর্মীয় গ্রন্থ, পুঁতিপত্র, তৈলচিত্র ও উপজাতীয় জীবনধারার বিভিন্ন আলোকচিত্র রয়েছে।

যেভাবে যাবেন রাঙামাটি
ঢাকা থেকে ইচ্ছে করলে সরাসরি রাঙামাটি আসতে পারেন। অথবা চট্টগ্রাম হয়েও আসা যায়। চট্টগ্রাম থেকে এর দূরত্ব মাত্র ৭০ কিলোমিটার। আর ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম হয়ে রাঙামাটি প্রায় সাড়ে ৩শ কিলোমিটার। ঢাকার কমলাপুর থেকে এস আলম, শ্যামলী ও ইউনিকসহ বিভিন্ন পরিবহনে যাওয়া যায়। এছাড়া চট্টগ্রাম নগরীর অক্সিজেন থেকে এক ঘণ্টা পরপর পাহাড়িকা বাস এবং প্রতি আধা ঘণ্টা পর বিরতিহীন বাস ছেড়ে যায় রাঙামাটির উদ্দেশে।

Please follow and like us:
0

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

CAPTCHA


error: Content is protected !!