সিয়েরা লিওনে ঈদ, ইবোলা সারভাইভার ও ছোট্ট শিশু (১)

আজ ঈদের দিন বলে সিয়েরা লিওনের রাজধানী শহর ফ্রিটাউনের পথঘাটে ট্রাফিক জ্যাম নেই একরত্তি। আমি শহরের একটি চিপাগলিতে গাড়ি না ঢুকিয়ে স্মুদলি তা পার্ক করি ঘানার দূতাবাসের সামনে। ডিপ্লোমেটিক এ মিশনটির গেটের উপর ডালপালায় ছড়ানো ফ্লেমিংরেড ট্রি-তে ঝেপে ফুটেছে ডগমগে লাল রঙের অসংখ্য ফুল। পার্কিং স্পেসটিও সয়লাব হয়ে আছে লোহিত বর্ণের ঝরা কুসুমে। কয়েকটি কিশোরী মেয়ে তা কুড়িয়ে গাঁথে তাদের ব্রেইড করা চুলে। তারা দূতাবাসের দুয়ারে লাগানো দরোজার কালো আয়নায় তাদের প্রতিবিম্ব নিরিখ করে কাঁধ ও বুকে শুভ্র হেজাব অ্যাডজাস্ট করে বর্ণিল বৃক্ষটির দিকে তাকিয়ে খিলখিল করে হেসে ওঠলে মনে হয়— ফ্রিটাউনের জীবনযাপন ফের নরমাল হয়ে উঠছে। মাত্র মাস দু’য়েক আগে দেশটি ঘোষিত হয়েছে ইবোলামুক্ত হিসাবে। গেলো বছর ইবোলা সংক্রমণের বিপজ্জনক দিনগুলোতে আমি এ শহরে ত্রাণ কর্মসূচিতে কাজ শুরু করি। গেলোবারের ঈদে নগরীর মসজিদগুলো ছিলো বিরাণ। গাড়িঘোড়ায় যাতায়াত ছিলো আইনিভাবে নিয়ন্ত্রিত। ঈদের দিনে লাশবাহী শকট ও অ্যাম্বুলেন্স ছাড়া অন্য কোনো গাড়িকে আমি ঘোরাঘুরি করতে দেখিনি। মেয়েরা সাজগোজ করে চুলে কুসুম গেঁথে ঈদগাহের দিকে যাওয়ার ব্যাপারটা ছিলো গেলো বছর অকল্পনীয়। আজকের পরিবর্তন নিরিখ করে আমার মাঝে ফ্রিটাউনে বসবাসের হিম্মত ফিরে আসে।

আমি পায়ে হেঁটে ঢুকে পড়ি চিপা গলিতে। এখানে আমি রাশিদাতু তারাওয়ালি নামে এক নারীর তালাশে এসেছি। পেশায় তাকে বলা চলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী— যারা ফ্রিটাউনে মারকিট উম্যান নামে পরিচিত। রাশিদাতুর কাছ থেকে আমি সমোসার মতো দেখতে মাছের পুর দেওয়া ফিশ-পাই কিনতে এসেছি। ঈদপোলক্ষে আমাকে জেমস মোহাম্মদ ওরায়লি বলে এক তরুণ দাওয়াত করেছে। আমি খালি হাতে জেমস মোহাম্মদের বাড়িতে যেতে চাচ্ছি না। ভাবছি, তার পরিবারের জন্য নিয়ে যাবো কিছু ফিশ-পাই। রাশিদাতুর বাসার কাছে এসে খানিক দূর থেকে দেখি, রাশিদাতু পিঠে বাচ্চা বেঁধে ঘরের বাইরে চুলায় হাড়ি চড়িয়েছেন। উনুনের পাশে বসে তিনি সেভেনাপের বোতল দিয়ে রুটি বেলছেন। আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বিষয়টি অবলোকন করি। ঠিক বুঝতে পারি না, তার আরও দু’টি সন্তান এখন কোথায়? ইবোলার বিপজ্জনক দিনগুলোতে রাশিদাতু জ্বরে আক্রান্ত হলে তাকে ইবোলা টেস্টিং সেন্টারে ভর্তি করা হয়। দিন তিনেক পর স্বাভাবিকভাবে জ্বর কমে গেলে, এবং পরীক্ষায় তার দেহে ইবোলার জীবাণু পাওয়া না গেলে, তাকে সেন্টার থেকে রিলিজ দেওয়া হয়। ঘরে ফিরে রাশিদাতু জানতে পারেন যে, তিনি ইবোলায় আক্রান্ত হয়েছেন, এ অতঙ্কে তার স্বামী বস্তি ছেড়ে পালিয়েছেন। রাশিদাতু ব্রিটিশ দূতাবাসের মিলিটারি অ্যাটাশের বাসায় গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতেন। শরীরে ইবোলার জীবাণু থাকতে পারে, এ সন্দেহে মিলিটারি অ্যাটাশে তাকে চাকরিচ্যুত করেন। আমরা ত্রাণ হিসেবে তখন ইবোলা সারভাইভারদের সামান্য মূলধন দিচ্ছিলাম, কিছু একটা করে জীবনধারণ করার জন্য। রাশিদাতু টেকনিক্যালি ইবোলা সারভাইভার নন। কিন্তু, আমার বিবেচনায় এ সমস্যার ভিকটিম। সুতরাং, আমি তাকে সারভাইভার হিসেবে তালিকাভুক্ত করে আমার কর্মসূচি থেকে কিছু মূলধন সরবরাহ করি। কাজটি ছিলো মিথ্যাচার, আমি এ পাপে পাপিষ্ট, তবে আমার অভীষ্ট ছিলো, রাশিদাতুকে সাহায্য করা, এবং তা বাস্তবায়িত হয়। রাশিদাতু স্বামীর অবর্তমানে চাকরিচ্যুত হালতে সামান্য মূলধন দিয়ে গড়ে তোলেন ছোট্ট একটি ব্যবসা। তিনি ফিশ-পাই তৈরি করে ট্রাফিক জ্যামে আটকে পড়া মানুষদের কাছে বিক্রি করতে শুরু করেন। আমি সড়কে দাঁড়িয়ে আছি দেখতে পেয়ে রাশিদাতু রুটি বেলা খ্যান্ত দিয়ে হাঁক পেড়ে কাকে কী যেনো বলেন। একটু পর তার আট বছরের মেয়েটি পলিথিনের ব্যাগে করে আমার জন্য নিয়ে আসে গরম গরম ফিশ-পাই। তা নিয়ে আমি ফিরে আসি গাড়িতে।

ঈদের জামাতে জেমস মোহাম্মদ ওরায়লির সঙ্গে দেখা হওয়ার কথা আছে। সুতরাং, আমি মসজিদের দিকে রওয়ানা হই। একটি গলি অতিক্রম করে মসজিদের কাছে এসে দেখি স্থানটি একেবারে নির্জন। তখনই চুলে ফ্লেমিংরেডের রক্তিম কুসুম গোঁজা মেয়েদের দেখতে পাই। এরা কপালে ‘উই হ্যাভ ডিফিটেড ইবোলা, হ্যাপি ঈদ’ লেখা ব্যান্ডেনা জড়িয়ে আইসক্রিম চুষতে চুষতে হেঁটে যাচ্ছে। এদের পেছন পেছন আমি এসে পড়ি স্কুলের মাঠে নামাজের জন্য জড়ো হওয়া প্রচুর লোকজনের জামাতে। ঈদের নামাজ পড়তে এখানে আজ প্রচুর নারীও জড়ো হয়েছেন। তাদের কেউ কেউ হিজাব বা চাদরে চুলমাথা ঢেকে সেলফোনে নিজেদের ছবি তুলছেন।

জামাত শুরু হতে খানিকটা দেরি আছে। ইট দিয়ে তৈরি ইমামের মেহরাবের কাছে দু’টি বৃহৎ সাউন্ডবক্সে রেডিওতে ক্রিয় ভাষায় ঈদপোলক্ষ্যে সরকারি ইশতেহারটি পড়ে শোনানো হচ্ছে। ইবোলা দূরীভূত হলেও জীবাণুর যেকোনো মুহূর্তে ফিরে আশার আশঙ্কা প্রবল। তাই, সরকারিভাবে রেডিও মারফত মুসল্লিদের হাত মেলানো ও আলিঙ্গন থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। আমি নামাজিদের ভিড়ে ঘোরাঘুরি করে জেমস মোহাম্মদ ওরায়লিকে কোথাও ট্র্যাকডাউন করতে পারি না। তাকে মোবাইলেও পাওয়া যাচ্ছে না। বিরক্ত হয়ে এদিক-ওদিকে তাকাচ্ছি, তখন দেখা হয় দাউদা কলোকয়ের সঙ্গে। ইনিও ইবোলা সারভাইভার। দেখি, দাউদা গোল টুপি মাথায় পয়পরিষ্কার একটি ফতুয়া পরে কাঁধে অনেকগুলো তসবি নিয়ে ফেরি করে বেড়াচ্ছেন। আমাকে দেখতে পেয়ে ইশারায় হাত মেলানোর ভঙ্গি করে ক্রিও ভাষায় বলেন, ‘হাউ ডি বডি বা আপনার শরীর-গতর কেমন আছে স্যার?’ তার সম্ভাষণের জবাব দিয়ে জানতে চাই, ‘দাউদা, জেমস কোথায়?’ তিনি জটলার দিকে ইশারা করেন। দেখি, জেমস ঝুড়িতে করে সংগ্রহ করা ঈদ ডোনেশনের টাকা গুনছে। চোখাচোখি হতেই সে আমাকে একটু অপেক্ষা করতে বলে। আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দাউদার তসবি বিক্রি দেখি। ইবোলায় আক্রান্ত হওয়ার আগে ইনি ফ্রিটাউনের বার দরিয়ায় নোঙর করা জাহাজের খালাসিদের কাছে নৌকায় করে শ্যাম্পু, টুথপেস্ট, আপেল ইত্যাদি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রির জন্য নিয়ে যেতেন। তার পূঁজিপাট্টা ছিলো খুবই সামান্য। আরও তিনজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর সঙ্গে মিলেঝুলে একটি নৌকা ভাড়া করে তিনি জাহাজে জাহাজে ফেরি দিয়ে মালমাত্তা বিক্রি করতেন। একদিন সন্ধ্যাবেলা ফেরি সমাপ্ত করে জেটিতে ফিরে আসার সময় তার শরীরে ফুটে ওঠে ইবোলার আলামত। দাউদা সংজ্ঞাহীন হয়ে কলাপস্ করলে তার সঙ্গী অন্যান্য ক্ষুদ্র-ব্যবসায়ী ও মাঝি আতঙ্কে তাকে নৌকায় ফেলে সাঁতার কেটে এসে ওঠে পাড়ে। অসুস্থ দাউদাকে নিয়ে মাঝিহীন নৌকাটি সমুদ্রে ভাসে পুরো দুই দিন। তারপর হসপিটাল শিপ বলে ভাসমান একটি হাসপাতাল নিয়ে ফ্রিটাউনে সেবা দিতে আসা ইংরেজ নাবিকদের চোখে পড়ে স্রোতে খাবি খাওয়া নৌকাটি। তারা দাউদাকে রেসকিউ করে হাসপাতাল শিপে তোলেন। ছয় সপ্তাহের চিকিৎসায় তিনি সুস্থ হয়ে পাড়ে নামেন। ততোদিনে তার ক্ষুদ্র ব্যবসা লাটে উঠেছে। যে সব দোকানদারদের কাছ থেকে বাকিতে মালমাত্তা নিয়ে তিনি জাহাজে যেতেন, তারা সংক্রমণের ভয়ে তার মুখের ওপর দোকান বন্ধ করে দরোয়ান দিয়ে তাকে পথ দেখিয়ে দেয়। ইবোলা রিকভারিফান্ড থেকে সামান্য কিছু পূঁজি ত্রাণ হিসাবে তাকে দেওয়া হয়। তা ব্যবহার করে এ বান্দা আজ অব্দি নানাবিধ ধান্দায় লিপ্ত হয়েছেন। কখনও তিনি ট্রাফিক জ্যামে আটকে পড়া মটরকারের আরোহীদের কাছে বিক্রি করেছেন পথিলিনের পাউচে করে প্যাকেট জিন ও রাম। কখনও সড়কদ্বীপে দাঁড়িয়ে তারস্বরে হেঁকে-ডেকে বিক্রি করেছেন বাতব্যাধিতে নিরাময়ের বাম। পরিবারে তার রোজগারের ওপর নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা ছয়। আমি ঈদের জামাতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তার ক্রমাগত জীবনযুদ্ধের বিষয়টি তারিফের দৃষ্টিতে অবলোকন করি।

নামাজের পর জেমস মোহাম্মদ ওরায়লির সঙ্গে বেরিয়ে আসার সময় দেখা হয় ইমাম আবু বকর মোল্লার সঙ্গে। তিনি ঝুড়িতে করে গোল্লা গোল্লা সাবান বিতরণ করছেন, আর বুঝিয়ে বলছেন- রোগের সংক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য কোনো কাজ করার পর পর হাত সাবানজলে ধুয়ে ফেলার প্রয়োজনীয়তার কথা। আমার সাথে চোখাচুখি হতেই তিনি দু’হাত বাড়িয়ে বাতাসে ইশারায় আলিঙ্গন করার নক্সা আঁকেন। আবু বকর তার বোন ও দু’টি ভাগ্না-ভাগ্নিকে হারিয়েছেন ইবোলার আক্রমণে। সারা বছর ইবোলা রোখার সংগ্রামে তিনি শরিক ছিলেন। সংক্রমণের আতঙ্কে আত্মীয়-স্বজনরা মরদেহের কাছে যেতে না পারলে, ইমাম দূর থেকে তাদের গায়েবি জানাজা পড়িয়ে দিয়েছেন।

জেমসকে নিয়ে গাড়িতে উঠতেই তরুণটি ইতিউতি করে বলে, ‘বসম্যান, আপনাকে একটি জিনিস দেখাতে চাচ্ছি স্যার’। সে একটি এনভেলাপ আমার দিকে বাড়িয়ে দেয়। আমি খাম খুলে ভেতর থেকে বের করি তার বাবা সিলভাসটার ওরায়লির একটি ফটোগ্রাফ। আমরা ফ্রিটাউনের যে রেসিডেনসিয়েল কমপ্লেক্সে বাস করি, ইবোলায় মৃত সিলভাসটার ওখানে কাজ করতেন মেনটেন্স ফোরম্যান হিসেবে। আমাদের ঘরদুয়ারে জেনারেটার, এসি বা ওয়াটার পাম্প কাজ না করলে কালিঝুলি মাখা ওভারঅল পরে মানুষটি ছুটে আসতেন, যন্ত্রপাতি ঠিক হওয়া মাত্র টুলবক্স হাতে আনন্দে পিট বাঁকিয়ে ঝুঁকে ঝুঁকে ড্যান্স করে বলতেন, ‘বসম্যান, এভরিথিং ইজ অলরাইট ইন ইয়োর হাউস নাউ’। তারপর সামান্য টিপসের জন্য হাত পাতলে তাকে দেখাতো বাজারে ভালুকের নাচিয়ে মানুষের মতো।

জেমস আমাকে ডিরেকশন দিয়ে নিয়ে আসে শহর থেকে সামান্য দূরে একটি জল প্রপাতের কাছে। আমরা গাড়ি থেকে নেমে প্রপাতের দিকে হেঁটে যাই। ঝ্যালঝ্যালে ওয়াচকোট পরা জেমসকে গালপাট্টা জুলফিতে কেন জানি শেক্সপিয়ারের কোনো নাটকের খল চরিত্রের মতো দেখায়। মানুষ হিসেবে তাকে আমি পছন্দ করলেও তার প্রতিটি আচরণের পেছনে গুঢ় থাকে ভিন্ন একটি উদ্দেশ্য। বেলা দুপুর বলে জলপ্রপাতে এ মুহূর্তে মানুষজন কেউ নেই। আমি সবুজাভ ঘাসের আস্তরণ ভাসিয়ে শিলাপাথর ভেঙে নেমে আসা প্রপাতের দিকে তাকিয়ে আন্দাজ করার চেষ্টা করি—আমাকে এখানে নিয়ে পেছনে কারণ কী থাকতে পারে। ইবোলা সারভাইভার জেমস মোহাম্মদ ওরায়লি রোগ সংক্রমণের পূর্ববর্তি দিনগুলিতে ফ্রিটাউনের একটি ভিডিও পার্লারে মুভি দেখানোর কর্মচারী ছিলো। তরুণটির শরীরে প্রাণশক্তি প্রচুর। হাসপাতালে রোগের সাথে মাস দেড়েক যুদ্ধ করে সে সুস্থ হয়ে ফিরে আসে সংসারে। কিন্তু ভিডিও পার্লারের চাকরটি সে আর ফিরে পায় না। কারণ, পার্লারের মালিকের ধারণা, জেমস ভিডিও দেখাতে গেলে সংক্রমণের ভয়ে কেউ মুভি দেখতে আসবে না। বর্তমানে জেমস ইবোলা রিকভারি ফান্ড থেকে ত্রাণ হিসাবে পাওয়া সামান্য পূঁজি দিয়ে গড়ে তুলছে তার ক্ষুদ্র ব্যবসা। সে জলপ্রপাতে বেড়াতে আসা যুগলদের কাছে কাজু বাদামের প্যাকেট ও পাইরেট করা থ্রি-এক্স ফিল্মের ডিভিডি বিক্রি করে।

Please follow and like us:
0

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

CAPTCHA


error: Content is protected !!