রাজস্থান, একটি পুরোনো গল্প

হঠাৎ ঠিক হলো রাজস্থান ঘুরতে যাবো। ট্রেনে জায়গা নেই। তাই ইন্টারনেট খুলে সার্চ করে দেখলাম, ফ্লাইট একটু কম দামে পাওয়া যাচ্ছে। অগত্যা ইণ্ডিগো বিমানের ওয়েবসাইট খুলে রিটার্ন টিকিট কেটে বসলাম। কলকাতা থেকে জয়পুর।
কিন্তু জয়পুরে থাকব কোথায় ? ট্রিপ এ্যাডভাইজারে রিভিউ পড়ে একটা হোটেল ঠিক করলাম। হোটেলের চেহারাটা বেশ পছন্দ হলো। পুরোনো কালের প্রাসাদ, তবে আয়তনে খুব বড় নয়। ওদেরকে ইমেল করতেই ওরা ওদের ব্যাঙ্ক এ্যাকাউন্ট নাম্বার পাঠিয়ে দিলো, তাতেই আমি এ্যাডভান্স টাকা জমা করে দিলাম। আর ইমেলে অনুরোধ করলাম, জয়পুর এয়ারপোর্টে একটা গাড়ি পাঠাতে।

জয়পুরে পৌঁছোলাম সকাল ৯টা নাগাদ। বেরিয়ে আসতেই দেখি বিভিন্ন ড্রাইভার হাতে নানা রকমের কাগজ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। একটাতে আমার নাম লেখা আছে দেখে তাকে হাত নাড়লাম।

হোটেলে পৌঁছে, দুপুরে স্নানের পরে খেতে গেছি, দেখি সেই ড্রাইভার দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে বলল, লোকাল সাইট সিয়িংয়ে চলুন, পুরো জয়পুর ঘুরিয়ে দেবো।
তাই হলো, খাওয়ার পরে সেই গাড়িতেই ঘুরতে বেরুলাম। রাস্তায় ড্রাইভার বলল, জয়পুরের বিখ্যাত লস্যি খাবেন ? আমি রাজি। আমার স্ত্রী-কন্যা ততদূর রাজি নয়।
তবু আমার আগ্রহে সেই দোকানে যাওয়া হলো। সত্যি অপূর্ব লস্যি, কী দারুণ তার স্বাদ !

জয়পুর ঘোরাঘুরির পরে সন্ধেবেলায় ফিরে এলাম হোটেলে। আমাদেরকে নামিয়ে দিয়ে ড্রাইভার বলল, এরপর আপনারা কোথায় যাবেন ? আমি বললাম, তেমন কিছু ঠিক নেই। আজমের-পুষ্কর, চিতোর, উদয়্পুর, জোধপুর, জয়সলমের… এসব ঘোরার ইচ্ছে আছে। ড্রাইভার বলল, তাহলে আমিই আপনাকে গাড়ি দেবো। আমি বললাম, আপনার গাড়িটা পুরোনো এবং ছোট। এসি ভালো কাজ করছে না।
ড্রাইভার বলল, এই পুরোনো গাড়িটা ছাড়াও আমার আরও ৪টি গাড়ি আছে। আমি জাতে সিন্ধি, ব্যবসায় কাউকে ঠকাই না। আপনাকে একেবারে নতুন একটা গাড়ি দেবো, টাটা ইণ্ডিগো, মাত্র ৬ মাস কিনেছি। সেই গাড়িটা আমি চালাবো না। আপনাকে একজন বয়স্ক ড্রাইভার দেবো – সে একাধারে ড্রাইভার, গাইড ও আপনাদের অভিভাবক হয়ে রাজস্থান ঘুরিয়ে দেবে– সে খুব ধার্মিক লোক, পুজো-আচ্চা করে, আমরা তাকে ‘পণ্ডিতজী’ বলি।

তার সঙ্গে মৃদু দর কষাকষি করে আমরা রাজি হয়ে গেলাম। মোট ৯ দিনের ঘোরাঘুরি। আমরা আগামী কাল নিজেরা নিজেদের মতো জয়পুর শহরে ঘুরবো। পর দিন অর্থাৎ তৃতীয় দিন সকাল ৮ নাগাদ আমরা বেরিয়ে পড়ব – জয়পুর থেকে আজমের ও পুষ্কর। পুষ্করে সরকারি টুরিস্ট লজ অন-লাইনে অগ্রিম বুকিং করেছি। সেখানে একরাত্রি থাকব।

তৃতীয়দিন সকালবেলা গাড়ির মালিক একটা নতুন গাড়ি নিয়ে হাজির। গাড়ির ড্রাইভার লম্বা-চওড়া দেহের বয়স্ক লোক, কপালে লাল তিলক জ্বল জ্বল করছে। গাড়ির মালিক আমাদের সঙ্গে গাড়িতে উঠে তার বাড়িতে নেমে গেল। তার স্ত্রীকে ডেকে এনে আমাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল। ড্রাইভার মিশ্রজী, আমরাও তাকে ‘পণ্ডিতজী’ বলে ডাকতাম, সত্যি সত্যি আমাদের গাইড ও অভিভাবকের মতো রাজস্থান ভ্রমণ করিয়ে দিয়েছিল।

এবার বলি, আজমের শরীফে পকেটমারের খুব উপদ্রব। পণ্ডিতজী বলেছিল, সাবধানে ঢুকবেন, কাছে মূল্যবান কিছু রাখবেন না।  গাড়ি সরাসরি আজমের শরীফের মাজারে যায় না। একটু দূরে গাড়ি রেখে অটোরিকশা নিয়ে যেতে হয়েছিল। আজমের-এর অটো-ড্রাইভারদের মতো এত বিশ্রী বজ্জাত লোক আমি কোথাও দেখিনি।

পুষ্কর শহরটা বেশ ভালো লেগেছিল। প্রচুর বিদেশী ঘুরে বেড়াচ্ছে। বেশ বর্ণময় শহর, যদিও আয়তনে খুব ছোট্ট। একটা দোকানে রাজস্থানী পাগড়ি কিনে আমার কন্যা যখন-তখন মাথায় পরে নিচ্ছিল। তবে মাঝেমধ্যেই পাণ্ডারা আমাদেরকে পাকড়াও করে পুজোর জন্য পীড়াপীড়ি করছিলো, প্রত্যেককেই বলেছি, আগামীকাল এসে পুজো দিয়ে যাবো।
সব পাণ্ডারাই তাদের মোবাইল নাম্বার আমাকে দিয়ে বলেছিল, সকালে এসে আমাকে কল করবেন।

পুষ্কর

পুষ্কর থেকে সকালে বেরিয়েছি, চিতোর পৌছে গেছি দুপুরের আগে। চিতোর ফোর্ট ঢোকার সময় রাস্তা এবার উঁচুতে উঠছে। পর পর অনেকগুলো তোরণ। সেসব পেরিয়ে গাড়ি যখন উপরে উঠলো, দেখি চারদিকে নানারকম ভাস্কর্য- খোদিত ভাঙা প্রাসাদ, মন্দির। সেসবের ফাঁকে ফাঁকে লোকজনের বসবাস। কেউ রাস্তায় স্নান করছে, কেউ থালা ধুচ্ছে, বাচ্চারা খেলা করছে।

বিখ্যাত জয়স্তম্ভ সবার উপরে উঁচিয়ে আছে। স্কুলে ইতিহাস বইয়ে এই জয়স্তম্ভের ছবি দেখেছিলাম, আজ স্বচক্ষে দেখা। সুলতান মামুদ শাহ-কে প্রতিহত করে যুদ্ধ জয় করা উপলক্ষে ৫৭০ বছর আগে মেবারের রাণা কুম্ভ এটা বানিয়েছিলেন।

রানা কুম্ভ নির্মিত জয়স্তম্ভ

জয়স্তম্ভের ভেতরে সিঁড়ি আছে, উপরে ওঠা যায়। ভেতরটা প্রায় অন্ধকার। আমরাও সিঁড়ি বেয়ে উপরে ওঠার জন্যে তৈরি, কিন্তু কোত্থেকে একপাল পঙ্গপালের মতো হা-হা হি-হি করা যুবক সেই সিঁড়িতে এমন হট্টগোল শুরু করলো যে আমরা ভেতরে ঢোকা থেকে বিরত হলাম।

জয়স্তম্ভের গায়ে মার্বেল পাথরে তৈরি নানা ভাস্কর্য। জল-হাওয়ার দাপটে ক্ষয় হতে বসেছে সেই অপরূপ কারুকার্য।

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রাজকাহিনী বইয়ের গল্পে আছে-
“রানা কুম্ভ চিতোরের সিংহাসনে বসেছেন। তাঁর রানী মীরা দেখতে যেমন, গান গাইতেও তেমন । রতিয়া-রানার মেয়ে মীরা । তাঁর গান শুনে রূপ দেখে রানা কুম্ভ তাকে বিয়ে করেন । রানী স্বামীর সেবা করেন কিন্তু মন তাঁর পড়ে থাকে রণ ছোড়জীর মন্দিরে বাঁশি হাতে কালো পাথরের দেবমূর্তির পায়ের কাছে । রানার কিন্তু এ ভালো লাগে না । …
“যুদ্ধ জয় করে ধুম-ধামে মহারানা চিতোরে এলেন। মামুদ শাহ-কে তার মুকুটের সঙ্গে রানা চিতোরে বন্ধ রাখলেন । রাজ্যের কারিগর মিলে পাথর কেটে চিতোরের মাঝখানে প্রকাণ্ড জয়স্তম্ভ তুলতে আরম্ভ করলে । কিন্তু মীরার মন রানা জয় করতে পারলেন না ; মীরা বললেন, ‘রানা, আমি নন্দলালার দাসী, আমাকে ঘরে বন্ধ কোরো না । আমি শুনতে পাচ্ছি আমার নন্দলাল বাইরে থেকে আমাকে ডাকছেন – “মীরা আয় ! আমাকে ছেড়ে দাও রানা, আমি পথের কাঙালিনী হয়ে নন্দলালার সঙ্গে বৃন্দাবনে চলে যাই ! রানা রেগে বললেন, ‘রতিয়া সামান্য সর্দার, তার মেয়ে তুমি ! তোমার কপালে সিংহাসন জুটবে কেন ? যাও বেরিয়ে – যেখানে খুশি – আমি নতুন রানী নিয়ে আসছি । সেইদিন চিতোরেশ্বরীর মীরা, নন্দলালার মীরা, ভিখারিনীর মতো একতারা বাজিয়ে পথে বার হলেন । আর রানা বার হলেন নতুন রানীর খোঁজে।”

বিজয়স্তম্ভ থেকে এলাম রানি পদ্মাবতীর মহলে। জলের মধ্যে একটা প্রাসাদ দেখিয়ে আমাদের গাইড-ড্রাইভার বলল, এই প্রাসাদে বসেই আয়নায় মুখ দেখিয়েছিলেন রানি পদ্মাবতী।
উপরের একটা প্রাসাদে একটা আয়নাও দেখলাম দেওয়ালে। এই আয়নাতেই নাকি আলাউদ্দিন রানি পদ্মাবতীর মুখের প্রতিফলন দেখেছিলেন। একটা মন্দির দেখিয়ে আমাদের ড্রাইভার বললো, এটা পদ্মাবতীর মন্দির।

রানি পদ্মাবতীর প্রাসাদ

অক্টোবর মাসের দুপুরবেলায় রোদের সে কী তীব্র তাপ। সারা মুখ কাপড়ে ঢেকে ঘুরছে আমার সহযাত্রীরা। … এখান থেকে বেরিয়ে একটা হোটেলে নিয়ে গেল আমাদের পণ্ডিতজী। সেখানে দুপুরের খাওয়ার পরে চললাম উদয়পুরের দিকে।

চিতোরগড় ছেড়ে উদয়পুরে এসে পৌঁছোলাম বিকেলের দিকে। উদয়পুরের মূল কেন্দ্রবিন্দু পিছোলা লেক ও একটি রাজপ্রাসাদ ‘সিটি প্যালেস’।

পিছোলা লেক একটি কৃত্রিম হ্রদ। তার চারপাশে ঘন হয়ে বেড়ে উঠেছে বাড়িঘর ও হোটেল। সেই লেকের মধ্যিখানে একটি প্রাসাদও আছে, যা এখন অভিজাত তাজ হোটেল। এখানে শুটিং হয়েছিলা রজার মুর ও কবির বেদী অভিনীত জেমস বণ্ড সিরিজের ‘অক্টোপুশি’ (Octopussy) সিনেমা। উদয়পুরের একটা রেস্টুরেন্টে দিনের পর দিন, সারাক্ষণ, অক্টোপুশি সিনেমাটা ভিডিওতে চলছিলো, দেখে বেশ মজা লাগল।

তাজ প্যালেস হোটেল

আমি যে হোটেল বুকিং করেছিলাম, সেই হোটেলের ঘর থেকে লেক দেখা যাচ্ছে না, কারণ সামনে অন্য একটা হোটেল দৃষ্টি রুদ্ধ করে রেখেছে। কিন্তু খোলা ছাদে উঠলে লেক পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল।

আমাদের ড্রাইভার ‘পণ্ডিতজী’র কিছু একটা ব্রত চলছিলো, তাই সারা সপ্তাহ তাঁর একবেলা আহার। সক্কালে উঠে গাড়ির মধ্যে ১ ঘন্টা পুজো-পাঠ চলে, তারপর কপালে লাল তিলক কেটে গাড়ি চালাতে বসে যান। দুপুরবেলা আমাদের সঙ্গে আহার (যদিও কোনও রেস্টুরেন্টেই ড্রাইভারের জন্য খাবারের দাম নেয়নি), আর তাঁর রাতে কোনও খাবার চলে না। … খবরের কাগজ পড়তেন মন দিয়ে ও সারাবিশ্বের নানা বিষয় নিয়ে আমাদের সঙ্গে গুরুগম্ভীর আলোচনা করতেন। সেই সঙ্গে রাজস্থানের ইতিহাস তাঁর নখদর্পণে, আমরা তাঁর কাছ থেকে সেইসব ইতিহাস শুনতাম।

আমাদের হোটেল থেকে পায়ে হাঁটা পথেই রাজপ্রাসাদ।সকালবেলা সেখানে ঢুকে পড়লাম। সেইসব রাজকীয় প্রাসাদের অলংকৃত কক্ষ দেখে অনেকটা সময় কাটানো গেল।
উপর থেকে উদয়পুর শহর, পিছোলা লেক এবং লেকের মধ্যে তাজ হোটেল, পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিলো। উদয়পুরে বিকেলবেলায় চাপলাম রোপওয়ে-তে। শূন্যে দুলতে দুলতে উঠে পড়লাম এক পাহাড়ের উপরে প্রশস্ত চাতালে, সেখানে ছোট রেস্টুরেন্টও আছে একটা। ভিড় তেমন নেই। আমরা চায়ের কাপ নিয়ে বসে থাকলাম একটা টেবিলে। উপর থেকে অনেকটা দূর পর্যন্ত দেখা যায়।

আস্তে আস্তে পাহাড়ের মাথায় সূর্য ডুবতে থাকলো। পিছোলা লেকের বুকে তাজ হোটেলে আলো জ্বলে উঠলো। উপর থেকে সে এক নয়নাভিরাম দৃশ্য।

উদয়পুরে সন্ধেবেলায় পিছোলা লেকের পাশে ঘুরছি, ইতিউতি আলো জ্বলে উঠছে, দূরে তাজ লেক প্যালেসে আলোর মালা, দারুণ দেখাচ্ছে। অক্টোবরের দুপুরে খুব গরম, কিন্তু সন্ধেবেলায় বেশ মনোরম আবহাওয়া। পৌঁছে গেছি গাঙ্গৌর ঘাটে।  একটি লোক স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে খবর দিলো, বাগোর-কি-হাভেলিতে আজ রাজস্থানী নাচ-গানের আসর বসেছে। আমরা তাই শুনেই দ্রুত পায়ে পৌঁছে গেছি বাগোর-কি-হাভেলিতে। একেবারে ঘাটের উপরে পুরোনো কালের অপরিচ্ছন্ন প্রাসাদ। টিকিট কাটতে গিয়ে তখনই মনে হয়েছিল টিকিটের দাম একটু চড়া। ভেতরে ঢুকে দেখি, বিদেশী-বিদেশিনীতে ভর্তি। একমাত্র ভারতীয় আমরাই। তাতেই বুঝলাম, টিকিটের দাম কেন চড়া।

প্রাসাদের ভেতরে একটা খোলা প্রাঙ্গণে বসেছে নাচ গানের আসর।  সামনে মাটিতেই বিদেশী টুরিস্টেরা বসে পড়েছে। পিছনের একটা বারান্দায় একটা বেঞ্চ পাতা ছিলো, সেটা খালি। আমরা সেটাতেই বসলাম। দু’ঘন্টা ধরে চলল অনুষ্ঠান। প্রথমে মূল কথক হিন্দি-ইংরেজি মিশিয়ে রাজস্থানী নাচ-গান নিয়ে সামান্য ভাষণ দিলেন।
শুরু হলো গান দিয়ে। তারপর নাচ। কখনও একক, কখনও দলবদ্ধভাবে, সেই নাচ যেন রঙের ঝরনা ঝরছে টিমটিমে আলোয়। মাথায় কলসি চাপিয়ে, কলসিতে আগুন নিয়ে, কখনও দাঁতে তরোয়াল আঁকড়ে ধরে … চলছে তো চলছেই। এরপর হলো পুতুল নাচ। সঙ্গে মুখ দিয়ে হরবোলার ডাক।

প্রায়ান্ধকার প্রাঙ্গণে শুধু রঙের ছলকে ওঠা, ক্যামেরায় ধরা প্রায় অসাধ্য হয়ে উঠেছিল।

উদয়পুরে ৩ রাত্রি কাটিয়ে এবার আমরা চলেছি জোধপুরের দিকে। আমাদের ড্রাইভার পণ্ডিতজী সকালবেলায় চলে এলেন তাঁর আস্তানা থেকে। সব শহরেই ড্রাইভারদের নিজস্ব চেনাজানা থাকে, সেখানে তাঁর রাত্রিবাস। আমাদেরকে বললেন, জোধপুর তো যাবেন, তার আগে আরও একটা জায়গায় আপনাদেরকে নিয়ে যাবো। বললাম, কোথায় ?
– সেটা এখন বলবো না। পৌঁছুনোর পরেই জানতেই পারবেন। বেশ, তাই হোক। … চলেছি পাহাড়ি রাস্তায়। কোথাও কোথাও রীতিমতো পাহাড়ের গায়ে আঁকাবাঁকা রাস্তা। গাড়ি থামিয়ে ছবি তোলা চলল।

ভর দুপুরে পৌঁছে গেলাম রনকপুর। পণ্ডিতজী বললেন, এই মন্দিরের কথাই আপনাদেরকে বলেছিলাম। এটা জৈন মন্দির। মাথার উপরে গনগন করছে সূর্য। বাইরে থেকে মন্দিরটা দেখেই তাক লেগে গেল।
কিন্তু পণ্ডিতজী খবর নিয়ে এসে বললেন, এখন মন্দিরে ঢোকা যাবে না, বেলা দুটোয় মন্দিরে প্রবেশ করা যাবে।  কী আর করি, অপেক্ষা করতে লাগলাম। মূল মন্দিরের ঠিক উল্টোদিকে আরও একটা ছোটো মন্দির আছে, সেখানেই আমরা বসে থাকলাম।

বেলা দুটোতে টিকেট কাউন্টারে প্রবেশমূল্য চুকিয়ে ঢুকে গেলাম মন্দিরের ভেতরে। সাদা মার্বেল খোদাই করে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে নানা কারুকার্য। ভেতরের কক্ষ বেশ শীতল। বাইরের তাপ এখানে প্রবেশ করতে পারছে না। আমরা ঘুরে ঘুরে দেখছি শিল্পীদের হাতের ঐশ্বর্য। বিশাল বিশাল থাম, তাদের গায়ে কতো অলঙ্করণ। সিলিং জুড়ে পাথর কুঁদে তৈরি করা ফুল ও আল্পনার সমারোহ। সেই সঙ্গে জৈন তীর্থঙ্করদের মূর্তি।
সত্যি বলতে কি, আমরা একেবারে বিস্ময়ে হাঁ হয়ে গেছি।

উদয়পুর থেকে জোধপুরের দিকে যাওয়ার সময় — ৯৫ কিলোমিটার দূরে রনকপুরে পেলাম বিখ্যাত জৈন মন্দির। পালি জেলার একটি ছোট জনপদ এই রনকপুর। তীর্থঙ্কর আদিনাথের স্মৃতিতে এই মন্দির বানানো হয় ৬০০ বছর আগে।
খুব হালকা রঙের মার্বেল পাথরের অপরূপ কারুকার্যে ভরা মন্দির। ভেতরে ঢুকলে আশ্চর্যরকমের প্রশান্তিতে মন ভরে যায়।

রনকপুরের জৈনমন্দির

শোনা যায়, সম্রাট আকবর এই জৈন মন্দিরে ঢুকে এতটাই অভিভূত হয়ে গেছিলেন যে একটি স্তম্ভে তাঁর নির্দেশনামা খোদাই করে দিয়েছিলেন, সেখানে তিনি আদেশ করেছিলেন, কোনও অবস্থাতেই কেউ এই স্থাপত্যের ঐশ্বর্য বিনষ্ট করতে পারবে না।

রনকপুর ছেড়ে চলেছি এবার জোধপুরের দিকে। রাস্তায় উটের পাল, ভেড়ার পাল দেখলেই ড্রাইভার পণ্ডিতজী বলছেন, ছবি তুলবেন নাকি ? আমি তো এক পায়ে খাড়া। গাড়ি থামতেই দৌড়ে নেমে পড়ছি।
আমার স্ত্রী একটু বিরক্ত হয়ে বলছেন, এতোবার গাড়ি থামাচ্ছো কেন ? পণ্ডিতজী কিন্তু সস্নেহে বলছেন, আহা ছবি তুলতে চাইছে তো তুলুক না, কোনও অসুবিধে নেই। পালি নামে একটা প্রায়-ঘুমন্ত জায়গা পার হচ্ছি। অপরাহ্ণেও রোদ্দুরের তীব্রতা অপরিসীম। হয়তো সেই কারণেই রাস্তায় লোকজন কম।

ধু ধু মাঠের মধ্য দিয়ে চলেছে কালো পিচ রাস্তা। হঠাৎ রাস্তার পাশে একজন মেষপালককে দেখেই চেঁচিয়ে উঠেছি, পণ্ডিতিজী গাড়ি থামান। গাড়িটা একটু এগিয়ে গিয়ে থেমেছে। আমি গাড়ি থেকে নেমে দৌড়ে পিছনের দিকে যাচ্ছি। দেখলাম, রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে সেই মেষপালক। সেই তীব্র রোদ্দুরে তার সম্বল একটি লাল পাগড়ি, যা সামান্য ছায়া বিছিয়ে রেখেছে তার কপালের উপর। তার বাঁ পায়ে বাঁধা আছে সাদা ও লাল রঙের দুটি ফিতে। তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তোমার নাম কী ? সে বললো, বাবু।

জোধপুরে থাকার জন্য আমি খুঁজেপেতে একটা বাড়ি আবিষ্কার করেছিলাম। বাড়ি না প্রাসাদ ! নাম, সদর হাভেলি হেরিটেজ। বাড়ির মালিক একজন স্কুল শিক্ষক ছিলেন, তিন বছর হলো অবসর গ্রহণ করেছেন। তাঁর ২০০ বছরের পুরোনো পৈতৃক বিশালাকার প্রাসাদের একটা অংশে গেস্ট হাউস চালু করেছেন। অন্য অংশে তিনি সপরিবারে থাকেন।
আমি তাঁকে ফোন করাতে তিনি খুশি হয়ে মাঝে মধ্যেই আমাকে ফোন করতেন। আমার যাওয়ার আগের দিন থেকেই তিনি আমার খোঁজ নিচ্ছিলেন। ড্রাইভারের হাতে ফোন দেওয়াতে তিনি ড্রাইভারকে পথনির্দেশ দিয়ে রেখেছিলেন।

বাড়িটা পুরোনো জোধপুরে। থই থই করছে মানুষ। সরু ঘিঞ্জি গলি। গলির পর গলি। ডাইনে বাঁয়ে …আবার ডাইনে …এইভাবে বাঁক নিতে নিতে সেই সদর হাভেলিতে পৌঁছে গেলাম। চওড়া গেট, গাড়ি ভেতরে ঢুকে গেল। একটুকরো উঠোন, সেখানে গাড়িটা রাখা হলো। সেদিন আমরাই একমাত্র পর্যটক। ৪টি ঘরের মধ্যে একটি আমরা বেছে নিলাম। ড্রাইভারের থাকার জন্য একটা ছোট্ট ঘর বিনা খরচে বরাদ্দ হলো।  রাতের বেলায় খোলা ছাদে আমদের জন্য খাওয়ার টেবিল সাজিয়ে দেওয়া হলো। বাড়ির মহিলাদের রান্না করা খাবার। অত্যন্ত সুস্বাদু। পরিমাণেও অঢেল। আমরা সামান্য তুলে নিয়ে বাকিটা ফেরত দিলাম। খোলা ছাদে বসে খাচ্ছি, আর চোখের উপরে জ্বল জ্বল করছে আলোকোজ্জ্বল মেহরানগড় দুর্গ। একেবারেই দুর্গের নিচেই আমাদের বাড়িটা।

মেহরানগড় প্রাসাদ

পরদিন সকালে ব্রেকফাস্টের পরে গেলাম মেহরানগড়। জোধপুরের সুবিখ্যাত দর্শনীয় স্থান। একজন গাইড সঙ্গে জুটলো। সুবিশাল প্রাসাদের কক্ষে কক্ষে রঙের ঝরনা উদ্ভাসিত হয়ে উঠছে। অল্প সময়ে দ্রুত বেরিয়ে আসা মুশকিল। অপার মুগ্ধতা নিয়ে ঘুরছি ভেতরে, ক্যামেরা বন্ধ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে।

মেহরানগড় দুর্গের ভেতরে এক বাঁশিওয়ালার দেখা মিললো।  আর বাইরের গলিতে দুর্গে ঢোকার মুখে বসে আছে গায়কের দল। কয়েকজন আমাদেরকে দেখেই উল্লাস করে ধাঁইধপাধপ বাদ্যি বাজিয়ে “বড়লোকের বিটি লো”র সুর শোনাতে লাগল। রাজারাজড়ার অস্ত্রশস্ত্র ও কারুকার্যখচিত প্রাসাদের চেয়েও আমার কাছে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে এই কলাকুশলীরা। এদের পূর্বপুরুষেরাই হয়তো রাজাদের মনোরঞ্জন করত। এখন পর্যটকের দাক্ষিণ্যের উপরে নির্ভর করে এরা বেঁচে আছে।

মনে হয়, রাজস্থানের এক শ্রেণীর মানুষের মধ্যে নাচ ও গান যেন রক্তের সঙ্গে মিশে আছে। রাস্তায় যত্রতত্র দেখা মেলে এই গায়কদের। রিসর্টে সন্ধেবেলায় এরা আসে গান শোনাতে। আর সুন্দরী মেয়েরা আসে নাচ দেখাতে। বিভিন্ন জায়গায় দেওয়ালে ঝোলে রঙিন পুতুলের সারি। আশ্চর্য বর্ণময় এক জগৎ। মরুভূমি ও উটের ধূসর জগৎ এই মানুষেরাই যেন রঙে রঙে ভরিয়ে দিচ্ছে।

মেহরানগড় দুর্গ দেখার পরেই গেলাম যশওয়ান্ত থাড়া। মহারাজা যশওয়ান্ত সিং দ্বিতীয়, ১৮৯৫ সালে মারা যান। তাঁর স্মৃতিতে তাঁর রানী এই স্মারক বানিয়ে রেখেছেন ১৮৯৯ সালে (প্রথম ছবিটা যশওয়ান্ত থাড়া-র)। অনেক পর্যটক এই জায়গাটিকে এড়িয়ে যান, কারণ এখানেই আছে মহারাজাদের বংশধরদের দাহ করার স্থান।

যশওয়ান্ত থাড়া, জোধপুর

এরপর – ম্যাণ্ডোর গার্ডেন। বিশাল এলাকা জুড়ে মন্দির ও প্রশস্ত চত্বর, কিন্তু একেবারেই রক্ষণাবেক্ষণ হয় না। এত সুন্দর জায়গাটা এভাবে অবহেলিত হচ্ছে দেখে খারাপই লাগল। গেছিলাম উমেদ ভবন দেখতে, তার চেয়েও বেশি আনন্দ পেয়েছি জোধপুরের সার্কিট হাউসের ম্যাড়মেড়ে বাড়িটা দেখে। কারণ এই সার্কিট হাউসেই তো উঠেছিলেন ফেলুদা !

Please follow and like us:
0

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

CAPTCHA


error: Content is protected !!