রবির আলোয় শান্তিনিকেতন ও বোলপুর ভ্রমণ

ভ্রমণের আনন্দ বরাবরই আমি উপভোগ করে থাকি। বিদেশ বিভুঁইয়ে কাজের মধ্যে থাকি বলে দেশে আসলে বন্ধুদের নিয়ে বেরিয়ে পড়ি নির্মল আনন্দের খোজেঁ ভ্রমণ পিয়াসী মনের খোরাক জোগাতে। আমাদের এই যাত্রায় ছিলেন আমি, কদির ভাই, টিটু ও রাব্বী। হেমন্তের তখন মাঝামাঝি। দার্জিলিং ঘুরে কলকাতা হয়ে গিয়েছিলাম শান্তিনিকেতনে। আমি তির্যক নাট্যদলের সদস্য, সেই সুবাধে নাটক মঞ্চায়ন নিয়ে কলকাতা আসা হয়েছিল অনেকবার কিন্তু শান্তিনিকেতন যাওয়া হয়নি। এবার সেই সুযোগ হাতছাড়া করলাম না।

আগেরদিন ট্রেনের টিকেট করে রেখেছিলাম বোলপুরের । হাওড়া রেলস্টেশন থেকে  সকালে শুরু হলো আমাদের শান্তিনিকেতনের উদ্দেশ্যে যাত্রা। কলকাতা থেকে শান্তিনিকেতনের দূরত্ব ১৫৯ কিলোমিটার। পথের দুপাশে নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতে দেখতে কখন যে ৩ ঘণ্টার পথ পাড়ি দিলাম বুঝতেই পারলাম না। স্টেশন থেকে সারাদিনের জন্য টকুটুক ভাড়া করলাম। আমরা বীরভূম জেলার বোলপুরে পৌঁছলাম তখন সকাল ১০টা। সকাল থেকে কিছুই খাইনি তাই কিছু খেয়ে দেরি না করে বেরিয়ে পড়লাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিষ্ঠিত বিশ্বভারতী দেখার জন্য। বিশ্বভারতী রবীন্দ্রনাথ প্রতিষ্ঠিত একটি বিশ্ববিদ্যালয়। এটি পশ্চিমবঙ্গের বীরভূমে অবস্থিত। বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯২১ সালে একই সময়ে আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ও প্রতিষ্ঠিত হয়।

শান্তিনিকেতনের ছাতিমতলা, বকুলবীথি, আম্রকুঞ্জ, ঘণ্টাতলা, নতুন বাড়ি, কালোবাড়ি, সিংহ সদন, শান্তিনিকেতন ভবন, কাঁচের মন্দির ইত্যাদির সঙ্গে হারিয়ে গিয়েছিলাম অন্য এক ভুবনে। এই সময়ে শান্তিনিকেতনের হিমেল বাতাস দেয় অনাবিল এক প্রশান্তি, খোয়াই বনের ফাঁকফোকড় গলিয়ে রোদের ঝিকিমিকি। লাল মাটির রাস্তা ধরে যখন টুকটুক গাড়ি যাচ্ছে তখন মনে পড়ে – আমার প্রাণের মানুষ আছে প্রাণে ‘…।

বিশাল এলাকাজুড়ে গাছপালায় ঘেরা প্রাকৃতিক পরিবেশে গড়ে উঠেছে এ বিশ্ববিদ্যালয়টি। একপাশে শান্তিনিকেতন অন্য পাশে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবনসমূহ ও হোস্টেল। চোখে পড়ল রামকিংকরের বিখ্যাত দুটি ভাস্কর্য। একটি হলো, দুই সাঁওতাল রমণী সন্তান নিয়ে কারখানায় কাজ করতে যাচ্ছেন। অপরটি সাঁওতাল শ্রমিক পরিবারের দেশান্তরে যাত্রা।

এখানে রয়েছে সংগীতভবন, কলাভবন, নাট্যঘর ও মালঞ্চ বাড়ি বর্তমানে যা বিশ্বভারতীর পাবলিকেশন অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। কলাভবনের ছাত্রদের জন্য নির্মিত ছাত্রাবাসটির নাম ব্ল্যাক হাউজ। এই ছাত্রাবাসটির বাইরের দেয়ালে আলকাতরার আস্তরণ দেয়া হয়েছে। ছাত্রীদের জন্যও রয়েছে কয়েকটি ছাত্রীনিবাস। পাশে রয়েছে পাঠভবন নামক একটি বিল্ডিং, এখানে দ্বিতীয় শ্রেণী থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়। এই প্রতিষ্ঠানের অভিনব ব্যাপার হলো, ২য় শ্রেণী থেকে ৮ম শ্রেণী পর্যন্ত ছাত্র-ছাত্রীদের ক্লাস সব সময় গাছতলায় হয়। একটি করে বড় গাছের চারদিকে এক লাইন করে ইট দাঁড় করিয়ে দিয়ে এরিয়া করা আছে। একটি বোর্ড এককোণায় রাখা হয় পাঠদানের জন্য। ছাত্র-ছাত্রীরা মাটিতে বসে। আমি টুকটুক গাড়ির ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করলাম, বৃষ্টি হলে কিভাবে ক্লাস নেয়া হয়?’ সে জানালো, বৃষ্টির দিনে ক্লাস বন্ধ থাকে। পরে প্রতিদিন একটি করে বাড়তি ক্লাস নিয়ে তা পূরণ করা হয়। তবুও কখনও এসব ক্লাসরুমের মধ্যে হবে না। নবম ও দশম শ্রেণীর ক্লাসগুলো হয় পাঠভবনে। পাঠভবনের পাশেই রয়েছে সিংহসদন, যেখানে উঁচুতে বড় একটি ঘড়ি ও তার নিচে বড় একটি ঘণ্টা ঝোলানো আছে। এই ঘড়িটির মাধ্যমে ক্লাসের সময় নিয়ন্ত্রণ করা হয়। নিচে ঝুলন্ত দড়িটি টেনে ক্লাস পরিচালনার জন্য ঘণ্টা বাজানো হয়।

ঘুরতে ঘুরতে এগিয়ে গেলেই চোখে পড়ে বড় একটি বিল্ডিং, রবীন্দ্রভবন। বর্তমানে এই বিল্ডিংটিকে মিউজিয়াম করা হয়েছে। এই মিউজিয়ামে বিশ্বকবির ব্যবহৃত জিনিসপত্র, তার স্বহস্তে আঁকা চিত্রকর্ম, গীতাঞ্জলী কাব্যগ্রন্থের জন্য প্রাপ্ত নোবেল প্রাইজটিও এখানে সংরক্ষিত আছে। কবি ও তার পরিবার যে জিপ গাড়িটি ব্যবহার করতেন তাও এখানে রয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন অসুস্থ হয়ে পড়েন তখন শান্তিনিকেতন থেকে যে বিশেষ ট্রেনে করে তাকে জোড়া সাঁকোর ঠাকুর বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল তার একটি মডেলও এখানে আছে।

যতদুর জানা যায়, কবিগুরু ছিলেন খুবই খেয়ালী মানুষ । তিনি একটি বাড়িতে বেশিদিন থাকতে পছন্দ করতেন না। শান্তি নিকেতনের এই এলাকায় তার দশটি বাড়ি আছে। আর এই রবীন্দ্রভবন এলাকাতেই রয়েছে পাঁচটি বাড়ি। সেগুলোর রয়েছে বিভিন্ন নাম। যেমন-উদয়ন, কোর্নাক, শ্যামলী, পুনশ্চ এবং উদীচী। একেক ঋতুতে তিনি একেক বাড়িতে অবস্থান করতেন।

শান্তিনিকেতন থেকে মাত্র চার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ‘আমার কুটির’। নানা জিনিসের পসরা সজ্জিত এই প্রতিষ্ঠানকে হস্তশিল্পের কার্যালয় হিসেবে গণ্য করা হয়। পথিমধ্যে শান্তিনিকেতনের খুব কাছে ‘সৃজনী শিল্পগ্রাম’ নামক আরেকটি দর্শনীয় স্থান। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যগুলোর মানুষের জীবনযাত্রা, শিল্প-সংস্কৃতির এক অপূর্ব সহাবস্থান রয়েছে এখানে। এরপর গেলাম রবি ঠাকুরের সেই বিখ্যাত ছড়া – আমাদের ছোট নদী’ র কুপাই নদীর ধারে। কুপাই এর উৎপত্তি ভাগীরথী নদী থেকে। এ নদীটি শহর থেকে বেশ ভিতরে নিভৃত গ্রাম এলাকায়। গাছপালায় ঘেরা এই কুপাই নদীর পাড়ে বসে রবীন্দ্রনাথ ভাবতেন। এই ভাবনাগুলোই পরবর্তীতে কাব্য এবং গানে রূপান্তরিত হতো। এখানে বসেই তিনি লিখেছিলেন, গ্রাম ছাড়া ঐ রাঙামাটির পথ।’ নদীটির একপাড়ে শালবন। তাই বেশ মুগ্ধ হয়ে নয়ন ভরে দেখে নিলাম।

ঘুরতে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অর্মত্য সেনের বাড়ির সামনে পৌঁছলাম। বর্তমানে এ বাড়িতে কেউ থাকেন না। শান্তিনিকেতন দেখতে এসে বুঝলাম এখানকার প্রকৃতি এবং পরিবেশ সাদামাটা জীবনযাপনের শিক্ষা দেয়। কোনো উঁচু দালান নেই, চারদিক ঘন সবুজ।

দুপুর গড়িয়ে বিকাল শেষ হতে চলল। নীল আকাশে রক্তিম আভা, হেলে পড়েছে সূর্য। বিদায়ের সব আয়োজন পূর্ণ। শান্তিনিকেতন থেকে সন্ধ্যার ট্রেনে কলকাতা রওনা হলাম। ট্রেনে হঠাৎ মনে পড়ল, মৃত্যুর কিছুদিন আগে কবি এই শান্তিনিকেতন সম্পর্কে লিখেছিলেন- যখন রব না আমি/মর্ত্যকায়ায়/তখন স্মরিতে যদি হয় মন/তবে তুমি এসো হেথা নিভূত ছায়ায়/যেথা এই চৈত্রের শালবন।’

বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতি বা রবি ঠাকুরের জীবন নিয়ে আগ্রহী ব্যক্তিদের জন্য শান্তিনিকেতন অনেকটা তীর্থস্থানের মতো বলা চলে। শান্তিনিকেতনে একবার ঘুরে আসার পরও আরেকটু দেখার ইচ্ছে থেকেই যায়। এ যেন রবি ঠাকুরের ছোটগল্প-“শেষ হইয়াও হইলো না শেষ”।

Please follow and like us:
0

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

CAPTCHA


error: Content is protected !!