যা কখনো করবেন না বিমানবন্দরে

কোনো দেশের যোগাযোগব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা হলো বিমানবন্দর। যাত্রী ওঠানামা থেকে শুরু করে আকাশপথে যোগাযোগের পুরো ব্যবস্থাই নিয়ন্ত্রিত হয় বিমানবন্দর থেকে। এমন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নিরাপত্তার কড়াকড়ি থাকবে এটাই স্বাভাবিক। নিরাপদ বিমানযাত্রা ও যাত্রীর নিজের নিরাপত্তার স্বার্থেই বিমানবন্দরে যাত্রীদের কিছু নিয়মকানুন কঠোরভাবে মানতে হয়। বিমানবন্দরের এসব নিয়মকানুন না মানা হলে নির্দিষ্ট ব্যক্তি যেমন অন্যের কাছে বিরক্তি ও ঝামেলার পাত্র হন, তেমনটি নিজের দেশ ও জাতীয়তাকেও লজ্জার মুখে ফেলেন।

বাণিজ্যের প্রসার ও বিদেশে বিশাল শ্রমবাজার সৃষ্টি হওয়ায় বর্তমানে প্রতিদিনই হাজার হাজার বাংলাদেশি দেশের বিভিন্ন বিমানবন্দর হয়ে বিদেশে যান এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিমানবন্দর হয়ে দেশে ফেরেন। অনেকক্ষেত্রেই বিমানবন্দরের নিয়ম না জানার কারণে তাঁরা নিজেরা যেমন নাজেহাল হন, তেমনটি নিজের অজান্তেই বাংলাদেশিদের সম্পর্কে বিদেশিদের কাছে নেতিবাচক ধারণার সৃষ্টি করেন। বিমানবন্দরে ও বিমানে চলাচলের ক্ষেত্রে নিয়মকানুনসহ মেনে চলার কিছু বিষয় তুলে ধরা হলো।

বোম আছে, উড়িয়ে দেব এমন কৌতুক কখনোই নয়
বিমানবন্দরের নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে নিরাপত্তা নিয়ে কৌতুক করতে যাবেন না। ‘বোমা আছে’ বা ‘উড়িয়ে দেব’ এমন কৌতুক কখনোই নয়। এর পরিণামে বিমানযাত্রা বাতিল তো হবেই, এমনকি কারাভোগও করতে হতে পারে। সম্প্রতি সঙ্গে বোমা আছে এমন কৌতুক করে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন নাগরিক দেশটিতে কারাভোগ করছে। একটি বিষয় মনে রাখা বিশেষ প্রয়োজন, বিমানবন্দরে আপনি হয়তো কৌতুক করার মুডে আছেন কিন্তু নির্দিষ্ট নিরাপত্তাকর্মী তার কাজ নিয়ে উদ্বিগ্ন। আর ওই কাজের অন্যতম একটি হলো কোনো অবস্থাতেই বিমানে বিস্ফোরক কোনো বস্তু ওঠাতে না দেওয়া।

লাগেজে তরল পদার্থ বহনে নিয়ম মানুন
বিমানে চলাচলের ক্ষেত্রে লাগেজের মধ্যে নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি শ্যাম্পু, সুগন্ধিসহ তরল পানীয় বা অন্য কোনো পদার্থ বহন করা যায় না। কোনো লাগেজ বেল্টে ওঠানোর পরও এর মধ্যে তরল থাকলে তা ধরা পড়ে। তখন বিমানবন্দরের নিরাপত্তাকর্মীরা ওই লাগেজ খুলে সব মালপত্র বের করে তরল পদার্থের বোতলটি পরীক্ষা করবেন। পরিমাণে বেশি মনে হলে এটি ফেলেও দিতে পারেন তারা। এই প্রক্রিয়ায় সময় নষ্ট হওয়ায় লাইনে থাকা অপর যাত্রীদের মধ্যে আপনার প্রতি বিরক্তি দেখা যেতে পারে। তাই এমনক্ষেত্রে লাগেজ বা হাতব্যাগে রাখা তরলের পাত্র ওপরের দিকে রাখতে হবে যেন সহজেই তা বের করে নিরাপত্তাকর্মীদের কাছে দেওয়া যায়। বিমানে তরল ওষুধ বা দুগ্ধপোষ্য শিশুর জন্য কোনো পাত্রে নেওয়া মায়ের দুধের ক্ষেত্রে তরল পদার্থ বহনের নিয়ম কিছুটা শিথিল করা হয়। ওষুধ বা দুগ্ধপোষ্য শিশুর জন্য কোনো পাত্রে নেওয়া মায়ের দুধের ক্ষেত্রে তরল পদার্থ বহনের নিয়ম কিছুটা শিথিল করা হয়।

সব বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি পরীক্ষা করা হয় না
অনেকেই বিমানবন্দরে নিরাপত্তাকর্মীদের বাধা পার হওয়ার সময় নিজের সব বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি বের করেন এবং সবগুলোই এক্সরে মেশিনে দেন। বিমানবন্দরে সব বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির পরীক্ষা করা হয় না। ল্যাপটপ বা কম্পিউটার এবং প্লে-স্টেশন, এক্সবক্স বা নিনডোর মতো ক্যাসেট ব্যবহৃত যন্ত্র এক্সরে করার প্রয়োজন হয়। মোবাইল, স্মাটফোন বা ট্যাবের মতো যন্ত্র এক্সরে করার প্রয়োজন নেই, শুধু নিরাপত্তাকর্মীদের বাধা পার হওয়ার সময় পকেট থেকে বের করে দেখালেই হলো।

নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে ঝামেলায় গিয়ে লাভ নেই
কোনো মালপত্র নেওয়ার ক্ষেত্রে নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে ঝামেলায় গিয়ে লাভ নেই। আগেরবার বিমানযাত্রায় কেউ না করেনি এবার কেন নিষিদ্ধ করা হলো-এমন কোনো ঝামেলায় গিয়ে শুধু সময়ই নষ্ট হবে। কারণ আপনার বিমান ধরার তাড়া, আর নির্দিষ্ট কর্মীদের হাতেই ওই সময় সব ক্ষমতা। যতটা সম্ভব আপসে বিষয়টি মিটিয়ে ফেলুন এবং নিরাপত্তাকর্মীদের নির্দেশমতো কাজ করুন।

বিমানবন্দরের নিরাপত্তা কুকুর থেকে সাবধান
অনেকেই পোষা প্রাণী পছন্দ করেন। কুকুর, বিড়াল বা এমন গৃহপালিত প্রাণী দেখলেই আদর করেন। তবে বিমানবন্দরের কাজে ব্যবহৃত কুকুরের বিষয়ে এমন মনোভাব দেখাবেন না। এই কুকুরগুলো বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত তাই আপনার আদর বোঝার চেয়ে আপনাকে সন্দেহ করে বসতে পারে। সেক্ষেত্রে মাদকের সন্ধানে নিরাপত্তাকর্মীদের হাতে নাজেহাল হওয়ার আশঙ্কা আছে।

নিরাপত্তাকর্মীদের পার হওয়ার সময় অস্বাভাবিক আচরণ নয়
নিরাপত্তাকর্মীদের সামনে দিয়ে পার হচ্ছেন। কর্মীরা ধাতব শনাক্তকরণ যন্ত্র দিয়ে শরীর খুঁজে দেখছে। এমন সময় জ্যাকেট বা প্যান্টের পকেটে হাত দেওয়া ঠিক নয়। নিরাপত্তাকর্মীরা অস্ত্র বা অন্যকিছু আছে বলে ভেবে বসতে পারেন। এমনক্ষেত্রে হাত দুটি ওপরের দিকে তুলে রাখা বাঞ্ছনীয়। আর অন্যান্য স্থানের চেয়ে বিমানবন্দরে ব্যক্তির কাপড়চোপড়ে ধাতব কোনো বস্তুর অস্তিত্ব খোঁজায় বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।

বিমানবন্দরে বা বিমানে সানগ্লাস পরবেন না
বিমানবন্দরে প্রবেশ ও বিমানে ওঠার পর সানগ্লাস না পরাটাই ভালো। অনেক সময় কোনো স্থান থেকে পালানো বা চেহারা লুকোনোর ক্ষেত্রে সানগ্লাস ব্যবহৃত হয়। বিমানবন্দরে নিরাপত্তাকর্মীদের কাছে শীর্ষ সন্ত্রাসী বা রাষ্ট্রীয় নির্দেশে আটকের জন্য নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের তালিকা ও ছবি থাকে। বিমানবন্দরে থাকা যাত্রীদের সঙ্গে এসব চেহারা মেলানোর চেষ্টা করেন নিরাপত্তাকর্মীরা। তাই সানগ্লাসে চেহারা ঢেকে রাখলে নিরাপত্তাকর্মীদের সন্দেহ হতে পারে।

লাইন ভাঙবেন না
নিরাপত্তাকর্মীদের বাধায় নির্দিষ্ট লাইন থাকে। ওই লাইন ধরে সেখানে আগাতে হবে। মনে রাখবেন লাইনে দাঁড়ানো সবারই তাড়া আছে। তাই, এই লাইন ভেঙে ভিন্নপথে সামনে আগানোর চেষ্টা করে অনেকেরই বিরক্তির কারণ হতে পারেন।

উচ্চ শব্দে ভিডিও দেখা বা গেম খেলা নয়
ফ্লাইট ছাড়ার আগে কিছু সময় পেয়েছেন। এই সময় কাটানোর জন্য গান, ভিডিওগান বা গেম ছাড়লেন। তবে অবশ্যই এর শব্দ কমিয়ে রাখবেন যেন অন্য কেউ এর দ্বারা বিরক্ত না হয়। আর এসবক্ষেত্রে ইয়ারফোন ব্যবহার করবেন না, কারণ এতে বিমানবন্দরে ঘোষিত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এড়িয়ে যেতে পারে।

মেজাজ হারানো যাবে না
বিমানবন্দরে রাগান্বিত হওয়ার মতো অনেক ঘটনাই ঘটতে পারে তবে মেজাজ হারানো যাবে না। বিমান দেরি হওয়ার কারণ নিয়ে বিমানবন্দরের কর্মীদের সঙ্গে রাগারাগি করে কোনো লাভ নেই।

বিমানবন্দরের নারী কর্মীর সঙ্গে খাতির জমানো নয়
বিমানবন্দরের কোনো নারী কর্মী হাসিমুখে কিছু বললেন এর মানে এই নয় যে আপনি তার সঙ্গে খাতির জমাতে পারেন। হাসিমুখে কিছু বলা তার কাজেরই অংশ এবং তিনি প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের সঙ্গেই হাসিমুখে কথা বলেন। তাই বাড়তি কথা বলতে গিয়ে বিরক্তির কারণ হতে পারেন।

অপেক্ষা করতে গিয়ে ঘুমানো যাবে না
প্রচ- ক্লান্ত। বিমান ছাড়তে এখনো ঘণ্টাখানেক বাকি। একটু ঘুমিয়ে নেওয়া যাক- বিমানবন্দরে ঢোকার পর এমন চিন্তা কখনোই করবেন না। একটু ঘুমাতে গিয়ে ফ্লাইট মিস হওয়ার আশঙ্কা থাকে। আর নির্দিষ্ট ফ্লাইট মিস হওয়া মানে পুরো বিমানযাত্রা প্রক্রিয়া পুনরায় করতে হবে।

মাতাল হওয়া যাবে না
অধিকাংশ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মদের তেমন কোনো কড়াকড়ি নেই এবং সেখানে এটি সহজলভ্যও। তবে বিমানবন্দর ও বিমানের মধ্যে কোনোভাবেই মাতাল হওয়া যাবে না। এর ফলে নিজের যাত্রা ঝুঁকিপূর্ণ করার পাশাপাশি অন্যের জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারেন।

হাতেই রাখুন বোর্ডিং পাস ও পরিচয়পত্র
নিরাপত্তাকর্মীদের কাছে যাওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায়ই বোর্ডিং পাস ও পরিচয়পত্র হাতে নিতে হবে। এতে নিরাপত্তাকর্মীদের কাছে যাওয়ার পর আনুষঙ্গিক কাজ দ্রুত হবে এবং লাইনে থাকা সবাই এতে উপকৃত হবেন।

বেল্ট, ঘড়ি, জ্যাকেট ও জুতা খোলার জন্য তৈরি থাকুন
আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে শুধু ১২ বছরের নিচে ও ৭৫-ঊর্ধ্ব বয়সের ব্যক্তি জুতা ও হালকা জ্যাকেট পরেই নিরাপত্তাকর্মীদের বাধা পার হতে পারবেন। কোন কোন বিমানবন্দরে অন্য সবার ক্ষেত্রেই জুতা, ঘড়ি, জ্যাকেট ও বেল্ট খুলতে হবে। তাই লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায়ই এসব খোলার প্রস্তুতি নিয়ে রাখুন। নিরাপত্তাকর্মীদের কাছাকাছি এলে এগুলো খুলে ফেলুন। এতে আপনার কাজও দ্রুত শেষ হবে এবং লাইনও দ্রুত এগোবে।

সঠিক লাইন খুঁজে নিন
অধিকাংশ বিমানবন্দরে অনেকগুলো লাইন থাকে। কিছু লাইন থাকে নিয়মিত বা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ যাত্রীদের জন্য। আবার বড় পরিবারের জন্যও বিশেষ লাইন থাকে। সঠিক লাইন খুঁজে বের করে দাঁড়ান। ভুল লাইনে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ সময় নষ্ট করার কোনো মানে হয় না। যুক্তরাষ্ট্রের অনেক বিমানবন্দরে নির্দিষ্ট অ্যাপ ব্যবহার করে দ্রুত এগোচ্ছে এমন লাইন খুঁজে নিতে পারেন।

বিমানবন্দরের নিয়মকানুন বারবার পড়ুন
নির্দিষ্ট বিমানবন্দরে নিয়মকানুন বারবার পড়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিন। কোন টার্মিনালে যেতে হবে, কোন কোন জিনিস হাতে রাখতে হবে, কী কী কাগজপত্র দেখাতে হবে এই বিষয়গুলো নিয়ে আগে থেকেই প্রস্তুতি নিন। এতে বিমানবন্দরের কাজ নির্বিঘেœ শেষ করা যাবে।

ফ্লাইটের জন্য সদা প্রস্তুত
ফ্লাইটের জন্য নির্দিষ্ট গেটে যাওয়ার ঘোষণার ব্যাপারে কান পেতে থাকতে হবে। এমন ঘোষণা শোনার সঙ্গে সঙ্গে নিজের গেট খুঁজে নিতে হবে। আধুনিক এই যুগে সিট নির্দিষ্ট করা থাকলেও বিমানে ওঠার জন্য এই দ্রুততার কারণ সিটের ওপরের কেবিনেটে খালি পাওয়া। কয়েক মিনিটের দেরিতেই দীর্ঘ লাইনের শেষে পড়তে হতে পারে। আর সিটে এসে দেখবেন ওপরের সব ক্যাবিনেট সহযাত্রীদের মালপত্রে বোঝাই।

হাসিঠাট্টার মাত্রা বজায় রাখুন
বিমানবন্দরে হাসিঠাট্টার মাত্রা বজায় রাখুন। এখানে অধিকাংশ মানুষই ব্যস্ত। এমন ব্যস্ততার মধ্যে অনেকেই ঠাট্টাকে ভালোভাবে নেবে না। আর নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে ঠাট্টা করতে যাওয়ায় হিতে বিপরীত হওয়ার আশঙ্কাও থাকে।

বিমান দেরি হওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকুন
বিমানবন্দরে পৌঁছার পর নিজেকে মানসিকভাবে প্রস্তুত রাখুন, যে কোনো কারণে বিমানের দেরি হতে পারে। বিমানের অপেক্ষায় থেকে খেতে বসেছেন ওই সময় ঘোষণা হলো বিমান ছাড়ার সময় হয়েছে। খুব তাড়াহুড়ো করতে যাবে না। কারণ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায় গেটের কাছে এসে দীর্ঘ লাইন বা ফ্লাইট ছাড়তে আরো কিছুক্ষণ দেরি হবে।

Please follow and like us:
0

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

CAPTCHA


error: Content is protected !!