মেঘ-পাহাড় আর ঝরনার রাজ্য মেঘালয়

ভারতের সেভেন সিস্টার্স খ্যাত উত্তর-পূর্বে অবস্থিত আকর্ষণীয় এক রাজ্য মেঘালয়। পৃথিবীর সর্বাধিক বৃষ্টি প্রবণ এলাকা। মেঘালয়ের রাজধানী হচ্ছে শিলং। সিলেটের তামাবিল থেকে যার দূরত্ব মাত্র ৬৫ কিলোমিটার। মেঘালয়ে বছরভর মনোরম আবহাওয়া থাকে, বিশেষ করে শিলংয়ে। তবে মার্চ ও জুন মাস বেড়াতে যাওয়ার আদর্শ মৌসুম । মেঘালয় ভ্রমণের সময় গ্রীষ্মে হাল্কা উলের পোশাক ও শীতে ভারি গরমজামার ব্যবস্থা রাখতে হবে। বৃষ্টিপাত  এ অঞ্চলে যখন-তখনই হতে পারে। তাই ভ্রমণের সময় ছাতা আর রেইন কোটের ব্যবস্থা থাকলে ভালো।

তামাবিল এবং ডাউকি থেকে ইমিগ্রেশন এর কাজ শেষ করে আঁকা-বাঁকা, উচু-নিচু পথ পাড়ি দিয়ে শিলংয়ের দিকে যেতে যেতে মনে হবে, আপনি পৌঁছে যাচ্ছেন মেঘেদের বাড়ি। কোনো কোনো মেঘে ঢাকা পথ আপনাকে জানাবে উষ্ণ অভিনন্দন! পথ চলতে চলতেই কোনো না কোনো পাহাড়ের ভেতর থেকে শুনতে পাবেন ঝরনার শব্দ। দেখতে পাবেন বিশাল পাহাড় বেয়ে দুধ সাদা ঝরনার স্বচ্ছ পানি গড়িয়ে পড়ছে নিচে। প্রকৃতির এই অকৃত্রিম উদার রূপ মেঘালয়ের। এখানকার পাহাড়ের পর পাহাড় সবুজ গালিচার রূপ আপনাকে মুগ্ধ করবে।

এই অঞ্চলে বিভিন্ন উপজাতির বাস, তাই উৎসবেরও আধিক্য। খৃস্টান ধর্মাবলম্বীরা মহা সমারোহে পালন করেন বড়দিন, গুড ফ্রাইডে, ইস্টার, ইত্যাদি। ইংরেজি নববর্ষেও আনন্দমুখর হয়ে ওঠেন পাহাড়িরা।

শিলং পৌঁছাতে যদি দুপুর গড়িয়ে যায় সেদিন আর কোথাও না যেয়ে বিকাল বেলাটা শিলং শহরে ঘোরাঘুরি করে কাটাতে পারেন। হোটেল খুঁজে পেতে কিছু সময় লাগবে। পুলিশ বাজারের আশেপাশে অনেকগুলি হোটেল আছে, যে গুলোতে থাকতে পারেন। বিকেলে উমিয়াম লেকটাও ঘুরে আসতে পারেন। অথবা ডন ভসকো মিউজিয়াম, ওয়ার্ড লেক দেখে সময় কাটান। সন্ধ্যাটা রাখুন কেনাকাটার জন্য। চেরাপুঞ্জি বা সোহরা হচ্ছে শিলংয়ের মূল আকর্ষণ। যদি সংখ্যায় বেশী থাকেন নিজেরা একটা গাড়ী ভাড়া করে চলে যেতে পারেন।

  • যা দেখবেন 
  • সেভেন সিস্টারস ফলস – এটিকে মেঘালয়ের অন্যতম পর্যটন স্পট বলা হয়ে থাকে। পাহাড়ের গা বেয়ে ৭টি ধারায় নেমে এসেছে এই ঝরনাটি। যেখান থেকে ঝরনার পানি নিচে নামছে সেটিকে ইকোপার্ক বলে। এখানে দেখা যাবে মেঘের লুকোচুরি খেলা। দূর থেকে দূরবিন দিয়ে বাংলাদেশ দেখার সুবিধা আছে ।
  • মাউসামি কেইভ – চেরাপুঞ্জি শহর থেকে প্রায় ছয় কিলোমিটার দূরে। গুহাটি দেড়শ’ মিটার লম্বা। গুহার ভেতরের পাথরগুলো দেখে মনে হবে বহু বছর আগে আগ্নেয়গিরিতে গলে যাওয়া। ভয়ংকর দেখতে। গুহার ভেতরটাতে কৃত্রিম আলো রয়েছে। গা ছমছম অনুভূতি নিয়ে ফিরে আসা।
  • নোহকালিকাই ফলস 
  • নোহকালিকাই জলপ্রপাতটি সম্ভবত মেঘালয়ের বৃহৎ জলপ্রপাতগুলোর একটি। প্রায় এক হাজার ফুট উচুঁ সবুজ পাহাড় থেকে দুধ সাদা পানি সোজা নিচে নামছে। প্রচলিত উপকথা অনুযায়ী, কালিকাই এক মেয়ের নাম। যে কিনা এই জলপ্রপাত থেকে ঝাঁপ দিয়ে মারা গেছে বলেই তার নাম অনুসারে জলপ্রপাতটির নাম নোহকালিকাই ফলস।
  • মাওলিনং ভিলেজ-লিভিং রুট ব্রিজ
  • মেঘালয় সফরকালে অবশ্যই যাবেন এশিয়ার পরিচ্ছন্নতম গ্রাম হিসেবে পুরস্কারপ্রাপ্ত ভিলেজ মাওলিনং এ। এখানকার বিস্ময়কর সৌন্দর্য আপনাকে মুগ্ধ করবে। ভিলেজটি দেখতে দেখতে পৌঁছে যাবেন জীবন্ত শেকড়ের তৈরি লিভিং রুট ব্রিজ ও জলপ্রপাত। লিভিং রুট ব্রিজ অসম্ভব সুন্দর। ব্রিজটি গাছের তৈরি। স্থানীয় উমশিয়াং নদীর উপর একটি গাছের শেকড় পেঁচিয়ে তৈরি হওয়া দুটি ধাপের এই ব্রিজ প্রকৃতির নিজস্ব দান। বলা হয়ে থাকে, পৃথিবীর আর কোথাও এমন গাছের তৈরি ব্রিজ নেই। এটি দেখতে হলে আপনাকে প্রায় ৩ হাজার সিঁড়ি বেয়ে নামতে হবে এবং সেই ৩ হাজার সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হবে। যাওয়া আসা মিলে লাগবে কমপক্ষে ৪ ঘণ্টা। পথে যেতে যেতে মুগ্ধ করার মত অনেক কিছু দেখতে পাবেন। পর্যটকদের যাতায়াতের জন্য দুটো লোহার তৈরি ঝুলন্ত ব্রিজ রয়েছে।

গলফ লঙ্কি ও অর্য়াডস লেক
শিলং এ বেড়ানোর সময় যেকোনো একদিন চলে যেতে পারেন গলফ কোর্স দেখতে। পুরো এলাকায় যেন সবুজ কার্পেট বিছানো। এর কাছেই অবস্থিত অয়ার্ডস লেক। প্রায় ৫টি পাহাড়ের ভাঁজে কৃত্তিমভাবে তৈরি এই লেক বিকালে সময় কাটানোর জন্য দারুণ।

  • ডন বসকো ক্যাথেড্রাল
    শিলং এ অবস্থিত এই চার্চটি প্রায় ৫০ বছর আগে নির্মিত। স্থানীয় মানুষের দাবি অনুযায়ী, এই চার্চটি দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় চার্চ। স্থাপত্য শৈলীর কারণে দৃষ্টিনন্দন এই চার্চটি পর্যটকদের কাছে বেশ আকর্ষণীয়।
  • এলিফেন্ট জলপ্রপাত
  • অনেক বছর আগে ভূমিকম্পে একটি পাথর ধসে পড়ে। পাথরটি দেখতে হাতির মত বলেই এর পাশের জলপ্রপাতকে বলা হয় এলিফেন্ট জলপ্রপাত। জলপ্রপাতটির তিনটি ধাপ রয়েছে। সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামলেই এক এক করে জলপ্রপাতের সব ধাপ দেখতে পাবেন।

কিভাবে যাবেন কোথায় থাকবেন
ঢাকা বা চট্টগ্রাম থেকে প্রথমে সিলেট। সেখান থেকে টেক্সি বা বাসে তামাবিল। এখানেই ইমিগ্রেশন-কাস্টমস অফিস। বর্ডার পার হলেই মেঘালয়ের ডাউকি। ইমিগ্রেশনের আনুষ্ঠানিককতা শেষে একটি টেক্সি ভাড়া করে ফেলুন। এ ক্ষেত্রে সরাসরি শিলং চলে গেলেই ভালো। সময় লাগবে আড়াই ঘণ্টা। শিলং-চেরাপুঞ্জিতে চাহিদা অনুযায়ী হোটেল পাবেন। তবে বিশেষ দিনে গেলে আগে থেকেই রুম বুকিং করে যাওয়া ভালো।

  • শিলংয়ে থাকার ভাল জায়গা:
  • শিলং ক্লাব, ফোন নং: ৯১-৩৬৪-২২২৬-৯৩৮
  • হোটেল সেন্টার পয়েন্ট, ফোন নং: ৯১-৩৬৪-২২২৫-২১০
  • হোটেল ত্রিপুরা ক্যাসল, ফোন নং: ৯১-৩৬৪-২৫০১-১১১,২৫০১-১৪৯
  • হোটেল পোলো টাওয়ার্স, ফোন নং: ৯১-৩৬৪-২২২২-৩৪১
  • হোটেল আলপাইন কিন্টনেন্টাল, ফোন নং: ৯১-৩৬৪-২২২০-৯৯১
  • হোটেল পাইনউড, ফোন নং: ৯১-৩৬৪-২২২৩-১১৬
  • ইয়ুথ হোস্টেল, ফোন নং: ৯১-৩৬৪-২২২২-২৪৬
  • হোটেল আনন্দ, ফোন নং: ৯১-৩৬৪-২২২৩-৪৬৬
  • হোটেল উৎসব, ফোন নং: ৯১-৩৬৪-২২২৬-৭১৫
  • হোটেল মনসুন, ফোন নং: ৯১-৩৬৪-২২২৩-৩১৬

এছাড়া শিলং পুলিশবাজারে কমবেশি মানের আরো হোটেল আছে থাকার জন্য । ভাড়া ডাবল রুম ১ হাজার থেকে ৭ হাজার রুপি পর্যন্ত।

শিলংয়ে খাবার জায়গা দেদার। রকমফেরও অঢেল। বার্গার, পিৎজা, মিল্কশেক, স্যাণ্ডউইচের দোকান রাস্তার মোড়ে হামেশাই পাওয়া যায়। চাইনিজ খাবার ও তিব্বতি মোমো-থুকপাও পাওয়া যায় বেশ কিছু দোকানে । বাঙালি হোটেলও আছে। ১০০ থেকে ৩০০ রুপিতে ভাত-মাছ-মাংস-রুটি সবই পাবেন।

প্রয়োজনীয় তথ্য :

  •  শিলং যাওয়ার জন্য মেঘালয়ের ডাউকি বর্ডার সহজ মাধ্যম। সিলেটের তামাবিল বর্ডার পার হলেই ডাউকি। এখান থেকে ট্যাক্সি পাওয়া যায়    শিলংয়ের। শিলং যেতে চাইলে ভিসার আবেদনে ডাউকি বর্ডার উল্লেখ করুন।
  • যাওয়ার আগে সোনালী ব্যাংকে ৫০০ টাকা ভ্রমণ কর দিয়ে নিন।
  •  মেঘালয়ে আসামী ট্যাক্সি ড্রাইভার থেকে দূরে থাকবেন, এরা আপনার সাথে বিভিন্ন ধরণের প্রতারণা করতে পারে। গারো/খাসিয়া ট্যাক্সী ড্রাইভার নিবেন।
  •  সন্ধ্যার সাথে সাথে এখানে মোটামুটি লোক চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। তবুও মুভি দেখেতে যেতে পারেন। যদিও সিনেমা হলটা খুব ভালো কিছু না।
  •  খাবার সময় মনে রাখবেন রুই মাছ সবচেয়ে সস্তা এবং ইলিশ মাছ সবচেয়ে দামী, ভুলেও বাংলাদেশ থেকে ৬ মাস আগে রপ্তানী করা ইলিশ মাছ খাবেন না।
  •  রবিবার মোটামুটি সব কিছুই বন্ধ থাকে, কখাটা মাথায় রাখবেন।

টুকিটাকি

বেড়ানো শেষে কেনাকাটা করতে হলে শিলংয়ের পুলিশ বাজারের দোকানগুলোয় যাওয়া যায়। এখানে সবকিছুতে দরদাম চলে। এ ছাড়া শহরে আছে বেশ কিছু অত্যাধুনিক শপিং মল। স্থানীয় উপজাতিদের হাতে তৈরি জিনিসপত্রের সম্ভার পাওয়া যায় এখানে।

নানা সরকারি ও বেসরকারি ব্যাঙ্কের শাখা আছে শিলংয়ে। শিলং ক্লাবের কাছে কাছারি রোড-এর ভারতীয়ে স্টট ব্যাঙ্কে পাওয়া যাবে বিদেশি মুদ্রা সংক্রান্ত তথ্য। অনেক দোকান ও হোটেলেই ক্রেডিট কার্ডে পেনেন্ট করার সুবিধে পাওয়া যায়। শিলং শহরে পুলিশের সদর দফতরের ফোন নং: ৯১ ৩৬৪ ২২২৪৪০০/ ১০০।

Please follow and like us:
0

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

CAPTCHA


error: Content is protected !!