মেকং নদীর তীরে

সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা নাগাদ এয়ার এশিয়ার ফ্লাইট কম্বোডিয়ার নমপেন থেকে আমাদের নিয়ে ব্যাংককের ডনমিয়ং এয়ারপোর্টে অবতরণ করলো।  দলে আমরা মোট ৩ জন। আমি, বন্ধু এবং বন্ধুপত্নি।  প্ল্যান ছিল রাতটা ব্যাংককে কাটিয়ে পরদিন লাওসের উদ্দেশে রওয়ানা করব। লাওসের ভিসা আমরা নমপেন থেকে সংগ্রহ করে নিয়েছিলাম।

এদিকে বেল্টে লাগেজ আসতে আসতে ইন্টারনেট ঘেঁটে জানলাম এই এয়ারপোর্টের উল্টো দিকে লাগোয়া একটি ট্রেন স্টেশন রয়েছে।  ব্যাংকক হুয়ালামপং স্টেশন থেকে ছেড়ে এই স্টেশন হয়েই লাওসের সীমান্তগামী ট্রেনটি যায় রাতে।  রাত ৯টা থেকে সোয়া ৯টার মধ্যে এটি এখানে এসে থামবে।  ট্রেনটি ধরতে চাইলে আমাদের হাতে তখনো প্রায় ঘণ্টাখানেক সময় আছে।  তাই তড়িঘড়ি করে এয়ারপোর্টের ৩য় তলা থেকে সংযুক্ত ওভারব্রিজ দিয়ে ডনমিয়ং ট্রেন স্টেশনে নামলাম।  টিকিট কাউন্টারে গিয়ে জানলাম শুধুমাত্র প্রথম শ্রেণির টিকিট ছাড়া আর কোন ক্যাটাগরির টিকেট নেই।  তাই বাধ্য হয়ে ১,৩১৭ বাথ (থাইল্যান্ড কারেন্সি) করে প্রতিটি টিকেট কিনতে হলো।

আধা ঘণ্টা পর ট্রেন এলো। এই লাইনে ট্রেনগুলো মিটার গেজে চলে।  বাইরে থেকে ট্রেনগুলো দেখতেও তেমন আকর্ষণীয় নয়।  তবে ভিতরে ঢুকে মনটা জুড়িয়ে গেল।  প্রতিটি সিঙ্গেল অথবা ডাবল কোপের সঙ্গে রয়েছে আয়নাসহ বেসিন।  সিটগুলোও আমাদের দেশের ট্রেনের চেয়ে খানিকটা চওড়া।

রাত ১ টার দিকে ডিনারের অর্ডার নিতে আসলো ওয়েটার।  আমরা সবাই ক্লান্ত ছিলাম।  তাই খেয়ে দেয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম তাড়াতাড়ি ।

ঘুম ভাঙলো পরদিন সকাল ৭টার দিকে।  জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরে চোখ রাখলাম।  চারিদিকে দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ মাঠ। মাঝেমাঝে গ্রাম্য ঘরবাড়ি।  বৃষ্টিও পড়ছে গুঁড়িগুঁড়ি।  মনে হচ্ছে যেন আমাদের দেশেরই কোন জেলার ওপর দিয়ে ট্রেনে করে যাচ্ছি।

 

থাইল্যান্ড এবং লাওস এর সীমান্তবর্তী রেল স্টেশন ননখাই  

আমাদের যাত্রা শেষ হবে থাইল্যান্ডের শেষ সীমান্ত স্টেশন নংখাইতে।  সকাল ৮টায় নংখাই স্টেশনে আমরা নেমে পড়লাম।  তবে যেসব দেশের লাওসে পোর্ট এন্ট্রি ভিসা সুবিধা আছে তারা এখন থেকে এই ট্রেনে করেই সোজা লাওসের রাজধানী ভিয়েনচিয়েন ঢুকে যেতে পারেন।  কিন্তু আমাদের দেশের জন্য সেই সুবিধা নেই।  তাই আমাদের এবার দুদেশের সীমান্ত ইমিগ্রেশনে যেতে হবে।  নংখাই স্টেশন থেকে টুকটুকে চড়ে ৩০ বাথ করে হাজির হলাম থাইল্যান্ড-লাওস ফ্রেন্ডশিপ ব্রিজের গোড়ায় থাই ইমিগ্রেশন অফিসে।  এখানে এসে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল থাইল্যান্ডের রি-এন্ট্রি ভিসা নেয়া।  ভিসা নিতে ২ কপি ৩৫x৪৫ সে.মি. ছবি, পাসপোর্ট, পূর্বের ভিসা এবং থাইল্যান্ডে শেষ এন্ট্রি সিলের ফটোকপিসহ নির্দিষ্ট ফরম পূরণ করে কাউন্টারে জমা করতে হবে।  ফি লাগবে ১০০০ বাথ।  সব মিলিয়ে সময় লাগবে আধা ঘণ্টার মতো।

রি-এন্ট্রি ভিসা নেয়ার পর ইমিগ্রেশনের কাজ সেরে লাওস ইমিগ্রেশনে যাওয়ার জন্য বাসের লাইনে দাঁড়ালাম।  জনপ্রতি ভাড়া ২৫ বাথ।  গাড়ি ছুটছে থাইল্যান্ড-লাওস ফ্রেন্ডশিপ ব্রিজের ওপর দিয়ে।  মেকং নদীর ওপর এই ব্রিজটি তৈরি হয়েছে। ব্রিজের নীচ দিয়ে কুলকুল করে বয়ে যাচ্ছে এই অঞ্চলের সুখ-দুঃখের সাথী ঐতিহ্যবাহী মেকং নদী।  ঠিক ১০ মিনিটের মাথায় বাস আমাদের নামিয়ে দিল লাওস ইমিগ্রেশনের কাছে।  ইমিগ্রেশনের আনুষ্ঠানিকতার আগে এখানে ট্যাক্স হিসেবে প্রতিজন ২০০ বাথ করে জমা দিতে হয়।  জেনে রাখা ভাল লাওসে আপনি দেদারসে থাই বাথ চালাতে পারেন।  ১ বাথ সমান ২৩৫ লাও কিপ বা চিপ।  লাওসের লোকেরা তাদের কারেন্সি KIP কে চিপ বলে।

                                                                                                                                           ব্যাংকক হুয়ালামপং ট্রেন স্টেশন  যেখান থেকে লাওসের উদ্দেশে ট্রেন ছেড়ে যায়

 ইমিগ্রেশন শেষে লাওসে ঢুকেই পড়লাম বিড়ম্বনায়।  আমরা কোথায় কোন হোটেলে উঠব তা কিছুই ঠিক করা ছিল না।  তাই মোবাইল-ইন্টারনেটের শরণাপন্ন হলাম।  থাইল্যান্ডের মোবাইল কোম্পানির নেটওয়ার্ক সিগন্যাল এখানেও পাওয়া যায়।  নেট ঘেঁটে একই এলাকায় ৩টা হোটেলের নাম র্ঠিক করলাম।  এর মধ্যে ভিলা শীশাবাদ মনের মতো হওয়ায় টুকটুকে করে উঠে ছুটলাম সেখানে।  ৩ জনের ভাড়া পড়ল ২০০ বাথ। ভিলায় ঢুকেই মন জুড়িয়ে গেল।  একটি সুইমিংপুলসহ অসাধরণ দেখতে ভিলাটি।  কেমন শান্ত গ্রামীণ অভিজাত পরিবেশ।  দরদাম করে ১৩ ডলারে নিয়ে নিলাম একটি এসি ডাবল রুম।  বেশ বড়সড় রুমের সঙ্গে লাগোয়া বিশাল বাথরুমও।  ইতোমধ্যে দূপুর হয়ে গেছে।  ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে পড়লাম লোকাল ফুড দিয়ে লাঞ্চ করব বলে রেস্টুরেন্টের খোঁজে।

ভিলা থেকে একটু হেঁটে এসে পেয়ে গেলাম রেস্টুরেন্ট।  সেখানে বিক্রি হচ্ছে আস্ত মাছের গ্রিল, গ্রিল করা পাখি, মুরগি, শাক-সবজি আরো কত কি।  আমরা ওখানে বসে না খেয়ে হোটেলে নিয়ে আসার জন্য পার্সেল অর্ডার করলাম।  মাছ, মুরগি আর নিজের মতো করে বানানো সালাদ।  তবে ভাত কিনতে গিয়ে পড়লাম ফাপঁড়ে।  আমাদের দেশের বিন্নি ভাতই তারা প্রতিবেলায় খায় আর সেটা প্লেট হিসেবে বিক্রি না করে কেজি হিসেবে বিক্রি হয়। প্রতি কেজি ৫০ বাথ।

বিকেলে বেরুলাম শহর দেখতে।  আবারো সেই বিকট শব্দের টুকটুকে চড়ে মেকং নদীর তীরে।  সেখানে বসেছে পণ্যের পসরা নিয়ে বিশাল হাট।  লোকজন কেউ কেনাকাটা করছে, কেউ নদীর পাড় ধরে বৈকালিক ভ্রমণ করছে, তরুণ-তরুণীরা মিউজিকের তালে তালে শরীরচর্চা করছে।  অন্যরকম ভাললাগা এক পরিবেশ।

লাওস দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। এর সরকারি নাম গণতান্ত্রিক গণপ্রজাতন্ত্রী লাওস। দেশটি পূর্বে ফরাসি-ইন্দোচীনের অংশ ছিল।  ১৯৫৩ সালে দেশটি স্বাধীনতা লাভ করে।  দেশটি ১৯৬০ এর দশকে ভিয়েতনাম যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে।  ১৯৭৫ সালে একটি সাম্যবাদী বিপ্লব দেশটির ছয় শতাব্দী প্রাচীন রাজতন্ত্রের পতন ঘটায় এবং একটি গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।  লাওস একটি পর্বতময়, স্থলবেষ্টিত দেশ।  এর উত্তরে চীন, পূর্বে ভিয়েতনাম, দক্ষিণে কম্বোডিয়া এবং পশ্চিমে ও উত্তর-পশ্চিমে থাইল্যান্ড ও মিয়ানমার। লাওস খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ এবং জাতিগতভাবে বিচিত্র।

Please follow and like us:
0

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

CAPTCHA


error: Content is protected !!