মিজোরামে কয়েকদিন

সত্যিই মানব সভ্যতা বিষ্ময়ে ঘেরা! সভ্যতার সাথে অগ্রগতি, জাতির উত্থান-পতন চলছেই। মায়া থেকে মহেঞ্জোদারো ,মেসোপটেমিয়ান -হরপ্পান সভ্যতার অস্থিত্ব নেই, আবার আদিবাসীদের হটিয়ে মার্কিনি-অষ্ট্রেলিয়ান নরডিক সভ্যতার সৃষ্টি হয়েছে দ্রুতলয়ে। এসব নতুন কথা নয়! বিষয় হচ্ছে এই বিশ্ব গতিতে আমরা কোথায় ? গন্তব্য কি? এক সময়ের দূর্গম মিজোরামে এসে আমার চক্ষু চড়ক! মাত্র শ’- দেড়শ’ বছর আগের এক মিশ্র নরমুন্ডু শিকারী জাতি (খুমি)আজ অভাবনীয় উচ্চতায়। তুলনায় নতুন তাদের জাতিসত্বা।  মিজোরা প্রায় শতভাগ শিক্ষিত এখন ।

ইতিহাস বলে আমাদের রাঙ্গামাটি থেকেই মিজোরাম শাসিত হতো। রাতের আইজল দূরপ্রান্ত থেকে দেখলে মনে হবে শত শত ‘বুর্জ আলখলিফা’ ভবন সারি সারি দাডিয়ে আছে! সুউচ্চ পাহাড়ের স্তরে স্তরে জ্যামেতিক নিয়মে গড়া বসতিভবনগুলো থেকে ঠিকরে আসা আলো রাঙিয়ে দেয় চারদিক ।  মূহুর্তে ভাবনায় আসে কিভাবে সম্ভব হলো! এ পার্বত্যভূমিতে পানির কোন বড় আধার নেই। কিছু দূরে শত শত ফুট নীচে আমাদের দেশের শীর্ণ খাল সদৃশ্য প্রবাহমান নদী। আরো দূরে ক’টি পাহাড়ে ঝর্ণা বা ফলস্।  পাহাড় ঘিরে স্তরে স্তরে পাকা সড়ক, ভবনগুলো গড়ে উঠেছে। কোন কোনটি ৮/১০তলা উচ্চতার । তবুও পানীয় এবং ব্যবহার্য পানির কোন সংকট নেই, তেমনি নেই পানি নিস্কাসনের বড় সমস্যা ।  শহরে পাহাড় ধ্বসের সম্ভাবনাও এড়ানো হয়েছে। যদি নগরজীবনের হাল বলি, হতবাক করা ব্যাপার ।  সরু সরু রাস্তার ধারে দোকানপাট। ক’টি চেইন রেষ্টুরেন্ট যেমন আছে তেমনি আছে ব্র্যান্ডেড শপ্।  গাড়ী চলছে নিয়ম করে। অসংখ্য ছোট ছোট ট্যাক্সি ক্যাব।নির্দিষ্ট স্থান ছাড়া পার্ক করার সুযোগ নেই। সড়কে দৃশ্যত মেয়েদের পদচারণাই বেশী।  প্রায় সবাই জিনস্ টপস্ পড়ছে। এটা এখন তাদের কমন ড্রেস । ভেরি স্মার্ট এন্ড ওপেন মাইন্ডেড। পশ্চিমা মানসিকতা লক্ষনীয়।  মনে হবে ব্যান্ককের কোন এলাকায় আছি।

আমি কলকাতা থেকে ফ্লাইটে পাশে পেলাম তেমন স্মার্ট দু’তরুনীকে।  পরস্পরে বান্ধবী।এমেলি এবং জিনা। দুজনে ব্যাঙ্গালোরে পড়াশোনার করছে ।  ফাইনাল ইয়ারে।একজন ফার্মেসীতে অন্যজন নার্সিং এ।  আলাপে জানতে চাইলাম , এয়ারপোর্ট থেকে শহর কতদূর এবং আমার তারকা হোটেলটির অবস্থান।  বললো প্রায় ২ঘন্টা ক্যাব ড্রাইভ।আমার ডেষ্টিনেশনের কাছেই নাকি ওদের বাসা।  ওরাই অফার করলো। ‘তুমি আমাদের সাথে যেতে পারো’।  সময় না নিয়ে বললাম ‘সে তো ভাল কথা।’ মাই প্লেজার।ইট উইল বি নাইস ফর মি।  অন্তত: জার্নিটা ইন্টারেস্টিং হবে।
এখানে এয়ারপোর্ট লাউন্জে ফরেনারদের রেজিস্টেশন করতে হয়। ওরাই নিয়ে গেল আমাকে। তারপর জার্নিতে অনেক আলাপ। গন্তব্যে নামিয়ে চলে যাওয়ার আগে কথা হলো। আগামীকাল মিজোরামের এক ট্রেডিশনাল ফেস্টিভাল আছে । ওরা আমাকে সেখানে নিয়ে যাবে।  বাহ্।  অপেক্ষা আগামীকালের।

মিজু তরুণ-তরুনীদের সাথে লেখক

আইজলে ফরেনারদের জন্য আরো একটি আবশ্যিক ফরমালিটি আছে। ২৪ ঘন্টার মধ্যে পুলিশ-সিআইডি অফিসে রিপোর্ট রেজিস্ট্রেশন করতে হবে।  ওখানেই পাসপোর্টে সীল করবে। হোটেল থেকে লাঞ্চ সেরে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে সিআইডি অফিসে গেলাম। ভাল লাগলো । সবাই বেশ কো-অপারেটিভ। এক সুন্দরী মহিলা অফিসার ল্যাপটপে আমার সব ডিক্লারেশন ইনপুট করছিলো । ছবিও তোলা হলো। তাকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বললাম। এখানে তোমরা সবাই ভীষন হেল্পফুল,এয়ারপোর্টেও । তার সৌন্দর্যের প্রশংসা করে ছবি তুলতে চাইলাম। সাথে সাথে প্রায় পাশে এসে দাঁড়ালো। গা ঘেঁষে। সেলফি নিলাম। সেও সহকর্মীকে বললো ছবি তুলে দিতে।
সেখানেই জানলাম, কিছুদূর স্টেডিয়ামে কি জানি একটা বড় ওপেন প্রোগ্রাম আছে । ৪টায় শেষ হবে। তখন বাজে ২টা প্রায়। ক্যাব নিয়ে সেখানে পৌঁছালাম ।
অসাধারণ-অসাধারণ! আমার লাইফ টাইম অভিজ্ঞতা।

সমাজ ও সংস্কৃতি মিলে এই মনুষ্য জীবন। সমাজের ভিত পরিবার ও ভূমি নিয়ে আর সংস্কৃতি হয় , চলমান জীবন এবং উৎসব নিয়ে। ধর্ম কর্মসহ বাদবাকী সব কিছুই এতেই গাঁথা। এটা কোন বই পুস্তক বা গম্ভীর কোন কথা নয়, এমূহুর্তে মনে এলো তাই আওডিয়ে দিলাম। মনে এলো এজন্যে যে, যুগে যুগে বিভিন্ন জাতিগোষ্টি সমাজবদ্ধ হয়ে নির্দিষ্ট বা মাইগ্রেটেট হয়ে আবাসবদ্ধ হয়েছে কোন এক ভূমিতে থির হতে। তারপরেই সামাজিক অনুশাসন তৈরী করে জীবনের ছন্দে পালা-পর্বণে আপন পরিচিতি বানিয়েছে। ধর্মও এই প্রক্রিয়ার অংশ । পুনঃপুনশ্চ বলি, এসব আমার একান্ত ব্যক্তিগত মত। একেবারে শুদ্ধ দাবী করি না। কথাগুলোর প্রসঙ্গ টানার কারণ হলো, মিজোরামও রাষ্ট্রসত্বা অর্জনে ঐতিহাসিক নানান চড়াই-উৎরাই কঠিন ধাপ অতিক্রম করেছে। ভারতের ২৯টি ইউনিয়ন স্টেটের মধ্যে এটির অবস্থান ২৩ তম।১৯৮৭ সালে স্টেটের মর্যাদা পায়। এর আগে ছিল আসামের একটি জেলা। দেশ বিভাগের পর ভারতের অতি দূর্গম এই অঞ্চলে চরম অভাব অনটন এমনকি দুর্ভিক্ষ অবস্থার সৃষ্টি হয়। অনেকটা তারই ফলশ্রুতিতে ১৯৫৯ সালে মিজো ন্যাশনাল ফ্রন্ট বা MNF সৃষ্টি হয়। প্রবাদ প্রতীম পো লাল ডেঙ্গা এটির প্রধান ছিলেন । ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত তারা অত্যন্ত ক্ষমতাধর হিসাবে প্রশাসনেও আধিপত্য রাখতো। এসময়ে চীন- পাকিস্তান তাদের সব ধরণের সহায়তা দিতো। এ অবস্থায় এটি আজ অবদি ভারতের একমাত্র আভ্যন্তরীন অঞ্চল যেখানে ভারতীয় বিমানবাহিনীকে নিজ দেশেই বহুদিন বোমা বর্ষন করতে হয়েছে। কাকতালীয়ভাবে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে ইন্দিরা গান্ধী MNF এর সাথে আনুষ্ঠানিক চুক্তি করে (২১ জানুয়ারী ‘৭১) এবং ইউনিয়ন টেরিটরি মর্যাদা দেয় যা ৮৭ সালে ফেডারেল স্টেটে উন্নীত হয়। মিজোরামবাসী এর আগে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধকালীন বার্মায় জাপানী আগ্রাসনের সময়ও বিমান বোমার স্বাদ (!) পেয়েছিল।

মিয়ানমার (বার্মা) ও বাংলাদেশের সাথে মিজোরামের প্রায় ৭২২ কিলোমিটার বর্ডার রয়েছে । বড় অংশ বাংলাদেশের সাথে হলেও মিয়ানমারের সাথে তাদের যোগাযোগ এবং বৈধ-অবৈধ বানিজ্যিক বিদ্যমান। আইজল থেকে মাত্র ১৭০ কিলোমিটার দূরে সীমান্ত শহর চম্পাই এখন রমরমা বানিজ্য কেন্দ্র ।থাই, চীনা, বার্মার পন্যের দেদার সরবরাহ সেখানে। ওপারে বার্মার সিট্যুই প্রদেশ। মিজোদের পূর্বপুরুষদের একাংশ সেখান থেকে এসেছে। Rng Dil নামে একটি এলাকায় এখনো তাদের প্রাচীন স্থাপনা (সামাজিক ধর্মীয় ) রয়েছে। কাছেই চীনের ইনান প্রদেশ। মিজুদের অপর একটা অংশ চীনা-বর্মী গোত্রীয় ।

  • মিজোরাম নিয়ে লেখা অনেক দীর্ঘ হতে পারে তাই এখানকার সাম্প্রতিক সংস্কৃতিক বা উৎসবে আমার প্রত্যক্ষ অংশ নেয়ার দুর্লভ সুযোগ ও সৌভাগ্য নিয়ে কয়েকছত্র ।
    . ল্যান্ডলক বা ভূমি বেষ্টিত মিজুদের সকল প্রধান উৎসব জুম চাষাবাদকে ঘিরে । যদিও এখন জুম চাষের প্রচলন প্রায় নেই। তাদের এই উৎসবগুলো ধর্মীয় উৎসবকেও (খ্রীষ্টমাস ইত্যাদি) ছাপিয়ে যায়।
    . প্রধান ৩টি উৎসব হলো আগষ্ট -সেপ্টেম্বরে Mim Kut বা ভূট্টা চাষ উৎসব। এটি বড়দের অনেকটা আনন্দমেলার মতো । ‘নাচা গানা পিনা ‘ সব হয় সর্বত্র খোলামেলা। দ্বিতীয়টির আমি এবার অভিজ্ঞতা নিলাম। অনন্যসাধারণ। Chapchar Kut . Kut মানে উৎসব। জুম চাষ শুরুর আগে ভাগে ( ঝোপ-ঝাড় পরিস্কার কালে) এটি করা হয়। মার্চের প্রথম সপ্তাহে এবং বৃহত্তমটি হচ্ছে Pawl Kut. ডিসেম্বর -জানুয়ারীতে। এটির উপলক্ষ ফসল তোলার সময়।
    . আমি ২ দিন Chapchar এর উৎসব আমেজে ছিলাম। সমস্ত আইজলবাসীরা যেন দিনভর স্টেডিয়ামে উৎসবস্থলে পডে ছিল নানান ট্রডিশনাল বসনে। সকল গ্রাম প্রত্যন্ত অঞ্চলেও একই সময়ে চলে উৎসব।
    লেখক: সম্পাদক, দি ডেইলি পিপলস ভিউ
Please follow and like us:
0

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

CAPTCHA


error: Content is protected !!