দ্য লাস্ট প্যারাডাইস অন আর্থ – মালদ্বীপ

 

অফিসের একঘেঁয়েমি কাজের চাপে হাঁপিয়ে পড়ছিলাম খুব। প্রতিদিন একই রুটিন, বেলা করে ঘুম থেকে ওঠা, অফিসের কাজে লেগে পড়া, কাজ সেরে শেষ রাতে বাসায় ফেরা। গেলো একটা বছর এভাবেই কাটছিল দিনগুলো। তাই ভাবলাম একটু ফুরসৎ দরকার, সে সঙ্গে দরকার গণ্ডী ছাড়া হয়ে এলোমেলো কয়টা দিন কোথাও কাটিয়ে আসা। কিন্তু কিভাবে? রাতে বাসায় ফিরে টিভি দেখতে দেখতে ভাবছিলাম কোথাও বেড়িয়ে আসি না কেন। তাহলে হয়তো কটা দিন আরাম-আয়েশে শুয়ে বসে আর ঘুমিয়ে কাটানো যাবে। কোথায় যাব ? কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি নাকি সুন্দরবন? নাহ্, এসবের কোথাও না, যদি যেতে হয় তবে দেশ ছাড়া হয়েই যাব। নয়তো মোবাইল ফোন নামক যন্ত্রটির যন্ত্রণায় ছুটির দিনগুলো যন্ত্রণাকাতর হয়ে পড়বে। এসব এলোমেলো ভাবনায় একের পর এক চ্যানেল পাল্টে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ TLC (ট্রাভেল এন্ড লিভিং চ্যানেল) -এ এসে রিমোর্ট স্থির হলো। সেখানে তখন দেখাচ্ছিল মালদ্বীপ। কিছুক্ষণ হা-হয়ে দেখলাম মালদ্বীপের অপরূপ সৌন্দর্য।

ভারত মহাসাগরের বিস্তীর্ণ জলরাশির বুক চিরে জেগে ওঠা প্রবাল প্রাচীর থেকে গড়ে উঠেছে দ্বীপরাষ্ট্র মালদ্বীপ। ছোট-বড় ১১৯২ টি দ্বীপ রয়েছে এই দেশে। এর মধ্যে ১৯২ টিতে রয়েছে মানব বসতি। ২৯৮ বর্গকিলোমিটারের এই দ্বীপরাষ্ট্রের ৯৭ শতাংশই জলভাগ। ২০১২ সালের হিসাব মতে মালদ্বীপের লোকসংখ্যা প্রায় ৩,২৮,৫৩৬ জন। এটি এশিয়ার সবচেয়ে ছোট দেশ। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা মাত্র ৪ ফিট ১১ ইঞ্চি। তাই মালদ্বীপ হচ্ছে এই গ্রহের সবচেয়ে নীচু ভূখণ্ড। মালদ্বীপের প্রধান আয়ের উৎস মৎস্য শিকার ও পর্যটন। অপরূপ সুন্দর এই দেশটির রয়েছে সুদীর্ঘ-সমৃদ্ধ ইতিহাস।

পৃথিবীর মানচিত্রে মালদ্বীপকে খুঁজে নিতে কষ্টকর হলেও যুগে যুগে এই দেশটিকে খুঁজে বের করে নিজেদের প্রয়োজনে ব্যবহার করেছে পর্তুগীজ, ডাচ এবং ব্রিটিশরা। সর্বশেষ ১৯৬৫ সালে মালদ্বীপ ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। মালদ্বীপ (সাউথ-এশিয়ান এসোসিয়েশন ফর রিজিওনাল কো-অপারেশন SAARC) সার্কভুক্ত একটি দেশ। এদেশের মুদ্রার নাম রুফিয়া (RUFIYA) সংক্ষেপে এমভিআর। বর্তমানে ১ মার্কিন ডলারের বিপরীতে পাওয়া যায় ১৫.৫০ টাকা। এখানকার আবহাওয়া প্রায় সারা বছরই এক রকম।

যেই ভাবা সেই কাজ, সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম মালদ্বীপেই যাবো। পরদিন ঘুম থেকে জেগে ফোন দিলাম চট্টগ্রামের অভিজাত ট্যুর এন্ড ট্রাভেল কোম্পানি বিফ্রেশকে। সেখানে আমার একজন সুহৃদ রয়েছেন, নাম মেহেদী হাসান। সজ্জন মেহেদী হাসানকে আমার প্রাথমিক ট্যুর প্ল্যান জানালাম। সে সাথে বললাম, সবচেয়ে কম খরচে যেনো মালদ্বীপে ট্যুরের ব্যবস্থা করা হয়। বাংলাদেশ থেকে উত্তরে নেপাল, ভূটান, ভারত, পূর্বে মায়ানমার, চীন, হংকং এবং দক্ষিণে থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর এবং ইন্দোনেশিয়ায় ইতোমধ্যে ৩৫ বার ভ্রমণ করেছি। তার বেশিরভাগই ভারতে। কিন্তু দক্ষিণ পশ্চিমে এই প্রথম যাওয়া। মনে মনে ভাবলাম সিদ্ধান্তটা ভালই নেয়া হয়েছে। কারণ মালদ্বীপ যাওয়া বা আসার পথে শ্রীলঙ্কাটাও বেড়িয়ে আসা যাবে। সবচেয়ে সুখের বিষয় হল দুটো দেশেই প্রবেশের জন্য বাংলাদেশীদের জন্য আগাম ভিসা নেয়ার কোন ঝক্কি-ঝামেলা নাই। শুধু বাক্স পেটরা গুছিয়ে উড়াল যানের টিকেটটা করে চড়ে বসলেই যথাস্থানে পৌঁছে যাওয়া যাবে। তাই ট্যুর প্ল্যানটা সাজালাম এভাবে প্রথমে ঢাকা থেকে সোজা চলে যাবো মালদ্বীপ, সেখান থেকে ৪ দিন পর কলম্বো। কিন্তু হঠাৎ মাথায় এলো কলম্বো যখন যাবই, তখন ভারতটা বাদ যায় কেন। কারণ কলম্বো থেকে খুব কম খরচে ভারতের চেন্নাই যাওয়া যায়। আর সেখানে আছে এ অঞ্চলের সবচেয়ে আধুনিক এবং নির্ভরযোগ্য হাসপাতাল এ্যপোলো চেন্নাই। সেখানে গেলে রথ দেখা কলা বেচার মতো বেড়ানোও যাবে এ্যপোলোতে গিয়ে স্বাস্থ্যটাও পরীক্ষা করিয়ে নেয়া যাবে। তাই ভারতের ভিসাটা করিয়ে নিলাম আগেভাগেই। শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত ট্যুর প্ল্যানটা দাঁড়ালো এরকম ঢাকা থেকে মালে, মালে থেকে কলম্বো, কলম্বো থেকে চেন্নাই, চেন্নাই থেকে ঢাকা।

এবার বাজেটের পালা। এতো লম্বা ট্যুর নিশ্চয়ই অনেক টাকার প্রয়োজন পড়বে। তাছাড়া আগে থেকেই জানতাম, মালদ্বীপ ভ্রমণ তুলনামূলক ব্যয়বহুল। তাই একদিকে বিফ্রেশকে টিকেট এবং হোটেলের দায়িত্ব দিয়ে আমি কদিন ডুবে রইলাম ইন্টারনেটে সস্তায় হোটেল এবং টিকেটের খোঁজে।

ঢাকা থেকে মালদ্বীপ যাওয়ার দুটি এয়ারলাইন্স আছে। একটি মালদ্বীবিয়ান এয়ার অন্যটি মিহিন লঙ্কা। মালদ্বীবিয়ান এয়ার ভারতের মাদ্রাজ হয়ে সোজা চলে যায় মালে আর মিহিন লঙ্কা যায় কলম্বো হয়ে। মিহিন লঙ্কায় ভাড়া তুলনামূলক কম হওয়ায় মিহিন লঙ্কাতেই টিকেট কনফার্ম করা হলো।

ঢাকা-মালে, মালে-কলম্বো রুটে ভাড়া গুণতে হয় ৩৩,৬০০ টাকা। এরপর কলম্বো থেকে চেন্নাই খুব সস্তায় একটা ফ্লাইট পাওয়া গেল, ভাড়া মাত্র ৫,৫০০ টাকা। তবে সময়টা খুব অসময়ে, ভোর ৪.২০ টায়। কি আর করা! দুটা টাকা বেশি সাশ্রয় হলেই আমার লাভ। ইন্টারনেট ঘেঁটেঘুটে হোটেলটাও পেয়ে গেলাম তুলনামূলক সস্তায়। হাজার ডলারের কোন কটেজে থাকার দুঃসাহস না দেখিয়ে প্রতিরাত মাত্র ৫০ ডলারে বুক করে নিলাম কোরাল হোটেল এন্ড স্পার একটি রুম। হোটেল বুকিং-এও ঝক্কি-ঝামেলার শেষ নেই। বুকিং-এ লাগবে আন্তর্জাতিক ক্রেডিট কার্ড। আমার কাছে ঐ বস্তু না থাকায় শ্রদ্ধেয় মনসুর ভাইয়ের শরণাপন্ন হলাম (ওসমান গণি মনসুর, সম্পাদক দৈনিক পূর্বদেশ)। তিনিই মালে আর কলম্বোর হোটেল বুক করে দিলেন।

ভোর থেকে ঝুম বৃষ্টি চট্টগ্রামে। খুব চিন্তায় পড়ে গেলাম। কারণ সকাল ৮.৪০-এ চট্টগ্রাম-ঢাকা আমার টিকেট করা আছে রিজেন্ট এয়ার-এ। আর একই দিন দুপুর ১২.১৫ এ ঢাকা-মালে ফ্লাইট। খারাপ আবহাওয়ার কারণে যদি এই ফ্লাইটটির যাত্রা পিছিয়ে যায়, তবে অনেক রিস্কে পড়ে যাবো। তাই প্রয়োজনীয় গোছগাছ সেরে বৃষ্টি মাথায় নিয়ে একটু আগেভাগেই বেরিয়ে পড়লাম চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উদ্দেশে। ভাগ্য ভালই বলতে হবে, খারাপ আবহাওয়া সত্ত্বেও যথাসময়ে বিমান উড়লো আকাশে। ঢাকায় পৌঁছে আন্তর্জাতিক টার্মিনালে গিয়ে প্রয়োজনীয় ফর্মালিটিজ সেরে ভিতরে চলে গেলাম। হালকা নাস্তা সেরে অপেক্ষা করতে লাগলাম মালেগামী ফ্লাইট মিহিন লঙ্কার। ওয়েটিং লাউঞ্জ-এ অপেক্ষা করতে করতে আশে-পাশে আমার সহযাত্রীদের দিকে চোখ বুলাতে গিয়ে অবাক হলাম। ভেবেছিলাম সহযাত্রীরা সবাই আমার মতো পর্যটক হবেন। কিন্তু এখানে দেখছি তার উল্টো, বেশিরভাগ যাত্রী বিভিন্ন কোম্পানির টি-শার্ট আর ক্যাপ পরে বসে আছেন। এদের অনেকেই মহিলা, মধ্যপ্রাচ্যের দুবাই-এ যাচ্ছেন গৃহপরিচারিকা হিসাবে। বাকিরা যাচ্ছেন মালে, তবে পর্যটক হিসাবে নয়, ওর্য়াকার হিসাবে। এই ভ্রমণের আগে আমার জানা ছিল না মালদ্বীপে এতো বাংলাদেশী শ্রমিক রয়েছে। আমাদের বিমানটি কলম্বো পৌঁছে দুবাইগামী যাত্রীদের এবং মালেগামী যাত্রীদের আলাদা-আলাদা বিমানে উঠিয়ে দিবে। হিসাব মতে কলম্বোতে আমাদের ৩ ঘণ্টা ১০ মিনিট যাত্রা বিরতি নিতে হবে।

ঢাকার স্থানীয় সময় ১২.১৫ তে আমাদের বিমান উড়লো আকাশে। ঢাকার আকাশ তখন মেঘাচ্ছন্ন হলেও একটু পর ঝকঝকে রোদেলা আকাশে এসে পড়লাম। ততক্ষণে বিমান মেঘের উপর দিয়ে চলা শুরু করেছে। নীচে ভেসে বেড়াচ্ছে পেঁজা তুলার মতো সারি সারি হালকা গম্ভীর মেঘ। বিমানের জানালা দিয়ে বাইরের তীব্র আলো এসে চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে প্রতিনিয়ত। ইতোমধ্যে শ্যামাবরণ সিংহলী বিমানবালারা আপ্যায়নে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। সবার পরনে শ্রীলংকান ট্রেডিশনাল পোশাক কেনডিয়ন (KENDYAN)।

তাদের গায়ে জড়ানো এই পোশাক দেখে শ্রীলংকার সাবেক প্রেসিডেন্ট চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গার কথা মনে পড়ে গেল। বিভিন্ন সংবাদে, রাষ্ট্রীয় সফরে তাঁকে এই পোশাকেই দেখা যেতো। বেলা ২.৩০টা নাগাদ আমরা শ্রীলঙ্কার আকাশে ঢুকে পড়লাম। লংকার আকাশে তখন উড়ে বেড়াচ্ছে ঘন কালো মেঘ। তার মানে নীচে বৃষ্টি হচ্ছে। বিমানের উড্ডয়ন স্তর ধীরে ধীরে নীচে নেমে আসতেই অনুমান সত্য হলো। কলম্বোতে বৃষ্টি হচ্ছে খুব। সে সঙ্গে লক্ষ করলাম অসংখ্য নারিকেল গাছে আবৃত এই শ্রীলংকান ভূ-খন্ড। যেদিকেই চোখ যায় সবখানেই নারিকেল গাছের সারি। এখন বুঝতে পারছি এক সময় আমাদের দেশের টেলিভিশনে নারিকেল তেলের বিজ্ঞাপনে কেন কলম্বোর কথা জুড়ে দেয়া হতো।

শ্রীলঙ্কার স্থানীয় সময় ৩.১৫ তে আমরা কলম্বো বন্দরনায়েক আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করলাম। আমি কানেকটিং ফ্লাইট-এর যাত্রী, তাই পরবর্তী বিমানের সময় না হওয়া পর্যন্ত এই এয়ারপোর্টেই শুয়ে-বসে ৩ ঘণ্টা কটিয়ে দিতে হবে। খিদা পেয়েছে খুব, কিন্তু হাতে শ্রীলঙ্কান মুদ্রা নেই। কিছু খেতে হলে চড়া দামে মার্কিন ডলারে কিনতে হবে। ঢাকা থেকে আসার পথে বিমানে যে খাবার দিয়েছিল তা দেখে তো আমার চোখ ছানাবড়া। ঈদের দিনে আমাদের গ্রামাঞ্চলে যে লাল সেমাই রান্না বা ভেজে পরিবেশন করা হয় সে সেমাইকেই ন্যুডলস-এর মতো রান্না করে পরিবেশন করা হয়েছে। সে খাদ্য দুএক চামচ মুখে দিয়ে আর খেতে পারিনি। তাই এখন খিদের জ্বালায় অস্থির হয়ে আছি। কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরির পর এয়ারপোর্ট রেস্টুরেন্টে বসে ৭ ডলারে একটা সেট লাঞ্চ নিয়ে কোন রকম ক্ষুধা নিবারণ করলাম।

সময় মোটেও কাটতে চায় না। ভাগ্য ভালো যে এয়ারপোর্টে  ফ্রি ওয়াইফাই সার্ভিস ছিল। তাই এক কোণায় বসে ফেসবুকে বন্ধুদের সাথে চ্যাট করে সময় পার করলাম।

বিকাল ৫.৪৫ নাগাদ ডাক এলো মালেগামী পরবর্তী বিমানে চড়ার। সবাই লাইন করে দাঁড়ালাম চূড়ান্ত নিরাপত্তা চেকিং এর জন্য। আমার সামনে পিছনে বেশিরভাগ যাত্রীই দেখি বাংলাদেশী। আমার তো ভিমরি খাওয়ার যোগাড়। এত বাংলাদেশী পর্যটক কি মালে যাওয়া-আসা করে? একটু পর ভুল ভাঙলো। কয়েকজনের সাথে আলাপ করে জানলাম, এরা সবাই মালদ্বীপে চাকরি করে, সবাই প্রবাসী বাঙালি।

একজন একজন করে সবাই নিরাপত্তা চেক পেরিয়ে ভিতরে প্রবেশ করছে। একটা বিষয় লক্ষ্য করে মেজাজটা একদম খিঁচে গেল। যাত্রীদের হাতব্যাগ, পেন্টের বেল্ট, মানিব্যাগ, হাতঘড়ি, পকেটে থাকা খুচরো কয়েন সব স্ক্যানারে দিতে হচ্ছে। কিন্তু পায়ের জুতা খুলে স্ক্যানারে দিত হবে এই প্রথম দেখলাম। ভাবলাম বাংলাদেশীদের জন্যই বুঝি শুধু এই নিয়ম। তাই নিজেকে খুব অসহায় মনে হল। প্যান্টের বেল্ট আর জুতা খুলতে খুলতে নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করলাম সিকিউরিটি অফিসারের কাছে। তাকে জিজ্ঞেস করলাম, এই নিয়ম কি শুধু বাংলাদেশীদের জন্য? তিনি হেসে বললেন, না। ঐ দেখো সাদা চামড়ার ওই লোকগুলোও জুতা খুলে প্রবেশ করেছে। তাদের দিকে তাকিয়ে মনটা শান্ত হল। দেখলাম কয়েকজন ফিরিঙ্গি আর এরাবিয়ান যাত্রী তখনো জুতার ফিতা বাঁধতে ব্যস্ত। এবার মিহিন লঙ্কার বদলে আমাদের বাহন হল শ্রীলঙ্কান এয়ার। ঢাউস সাইজের বিমানটি মালদ্বীপের আকাশে ঢুকতে ঢুকতেই সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। ঘুটঘুটে অন্ধকার ভেদ করে বিমান ছুটে চলেছে মালদ্বীপের রাজধানী মালের উদ্দেশে। বিমানবালারা যথারীতি আপ্যায়নে ব্যস্ত। আর যাত্রীদের পরিবেশন করা হল যথারীতি সেই সেমাই। তাই সেগুলো ফিরিয়ে দিয়ে জুস আর চকলেট চেয়ে নিলাম।

  • মালদ্বীপের ভিলিংগিলি দ্বীপে বাংলাদেশী কয়েকজন শ্রমিকের সাথে আমি। পরের ছবিতে এই দ্বীপেরই একটি বোট স্টেশন।

স্থানীয় সময় ঠিক সন্ধ্যা ৭.২০ টা। আমাদের বিমান মালের ভূমি স্পর্শ করল। ক্ষুদ্র পরিসরে শুধুমাত্র একটি রানওয়ে আর দোতলা একটা ভবন নিয়ে তৈরি মালে ইব্রাহিম নাসির আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর। যে দ্বীপটিতে এই বিমানবন্দর তার নাম হুলহোমালে (HULLHUMALE) বিমান থেকে নামতে নামতে সমুদ্রের ওপর দিয়ে বয়ে আসা বাতাসের ঝাপটা লাগছিল, অদ্ভুত এক অনুভূতি ভাল করে দিল মনপ্রাণ।

পাসপোর্ট হাতে নিয়ে ইমিগ্রেশন অফিসার জানতে চাইলেন মালদ্বীপ আগমনের উদ্দেশ্য। বললাম ছুটিতে বেড়ানো। তখন তিনি বিমানের ফিরতি টিকেট আর হোটেল বুকিং দেখতে চাইলেন। সেগুলো পরখ করে দেখার পর ৩০ দিন অবস্থানের অনুমতিসহ এন্ট্রি সীল দিয়ে বিদায় করলেন।

এয়ারপোর্ট থেকে বেরুনোর আগে কিছু খুচরো ডলার এক্সচেঞ্জ করে নিয়ে ফেরীঘাটের দিকে হাঁটা পথ ধরলাম। সাধারণত বেশিরভাগ দেশেই মানুষ এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে গাড়িতে করেই গন্তব্যস্থলের দিকে যায়। কিন্তু মালদ্বীপেই রয়েছে এর ব্যতিক্রম। এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়েই আপনাকে গাড়ির বদলে চড়তে হবে ফেরী নামক লঞ্চে। ১০ রুফিয়ায় টিকেট কেটে চড়ে বসলাম ফেরীতে। আসলে আমরা ফেরী বলতে যা বুঝি এটি তা নয়। মাঝারি আকারের একটা লঞ্চ মাত্র। চারদিকে ভারত মহাসাগরের গভীর কালো জলরাশি। তার বুক চিরে ফেরী ছুটে চলছে রাজধানী মালের উদ্দেশে। দেখতে না দেখতেই পৌঁছে গেলাম গন্তব্যে। ঘড়িতে সময় দেখে বুঝলাম মাত্র ১০ মিনিট লেগেছে ওপাড় থেকে এপাড়ে। ইতোমধ্যে অনেক বাংলাদেশী যাত্রীর সঙ্গে পরিচয় হয়ে গেছে। এখানে বেড়াতে এসেছি শুনে অনেকে বললেন, এহানে কি আর দেখবেন, চারদিকে খালি পানি আর পানি। মনে মনে হাসলাম।

একটি টেক্সি ডেকে হোটেলের নাম বলতেই উঠিয়ে নিল। আগেই জেনেছিলাম মালেতে যেখানেই যাই না কেন টেক্সি ভাড়া ২০ রুফিয়া। অর্থাৎ টাকার হিসাবে ২৫০ টাকার একটু বেশি। কিন্তু জানা ছিল না পথে যেতে যেতে সীট খালি থাকা পর্যন্ত সামনে যাকে পায়, তাকে তুলে নিবে। একটু ভড়কে গেলাম এই ভেবে যে, না জানি পিস্তল-চাকু ঠেকিয়ে টাকা-পয়সা সব কেড়ে নিয়ে যায়। ড্রাইভারকে আমার আশংকার কথা বুঝতে না দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, তোমাকে আমি হায়ার করেছি আর তুমি এক-এক করে ৩ জন লোক উঠিয়েছ। ড্রাইভার তখন দন্ত বিকশিত করে বলল, এদেশে এটাই নিয়ম। সীট খালি থাকা পর্যন্ত যেই হাত দেখাবে তাকে উঠিয়ে নিতে হবে।

কী আজব নিয়ম রে বাবা! মনে মনে বললাম। শহরের সরু অলিগলি পেরিয়ে একটুপর টেক্সি হোটেলের সামনে পৌঁছে দিল। ২০ রুফিয়া হাতে দিতেই আরো চাইল। বললাম, যা ভাড়া তাতো দিয়েছি, আরো কেন? সে বলল, শুধুমাত্র যাত্রী ২০, আর ব্যাগেজের জন্য এক্সট্রা ১০। যাহ্ বাবা! নতুন কিছু শিখলাম। হোটেল রিসেপশনে বুকিং-এর কাগজপত্র দেখিয়ে চাবি নিয়ে সোজা চলে গেলাম রুমে, হোটেলের ৭ তলায় ডাবল বেডের রুম। দীর্ঘ জার্নিতে বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম, ক্লান্তিতে শরীরটাও বেশ ভার হয়ে আছে। ঘড়ি দেখলাম, স্থানীয় সময় তখন রাত সাড়ে ৯টা। মালদ্বীপের সময় আমাদের চেয়ে এক ঘণ্টা পিছিয়ে। সে হিসাবে বাংলাদেশে রাত সাড়ে ১০টা। ভাবলাম বাড়িতে ফোন করে জানানো দরকার, নিরাপদে পৌঁছেছি। কিন্তু হোটেল রুম থেকে দেশে ফোন করার সাহস পেলাম না। কারণ বিদেশের হোটেল থেকে দেশে ফোন করা নিয়ে আমার খারাপ অভিজ্ঞতা আছে। এরা ১ টাকার বিল ১০০ টাকা করে নেয়, এমনি অবস্থা। সিঙ্গাপুরের এক হোটেল থেকে একবার না জেনে কয়েক মিনিট কথা বলেছিলাম দেশে। আর চেক আউটের দিন ওই কয় মিনিটের জন্য আমাকে বিল গুণতে হয়েছিল ৫০ ডলার। তাই ফ্রেশ হওয়ার আগেই সীম কার্ড কেনার জন্য বেরিয়ে পড়লাম। ততক্ষণে বেশ রাত হয়ে গেছে, তাই কোন ফোন কোম্পানির দোকান খোলা পাওয়া গেল না। পরে এক হোটেল বয়-এর ফোন থেকে মালদ্বীপ পৌঁছার খবরটা বাড়িতে জানালাম।

মালেতে আমি যে হোটেলে উঠেছি তার নাম কোরাল হোটেল এন্ড স্পা। এই হোটেলে ৩ জন বাংলাদেশী কর্মচারী রয়েছে। তাদের মধ্যে ২ জন রুমবয় অন্যজন সহকারী বাবুর্চি।

ভালই হলো। একজনকে ডেকে কোথায় বেড়ানো যায়, কিভাবে যাওয়া যায়, খাওয়া-দাওয়া কেমন এসব তথ্য বিস্তারিত জেনে নিলাম। রেস্টুরেন্টের বাংলাদেশী ছেলেটাকে বললাম, ঝাল করে গরুর মাংস আর সাদা ভাত দাও। রাতে আর কোথাও গেলাম না। খেয়ে দেয়ে লেপ্টে গেলাম বিছানায়।

মালদ্বীপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি। এখানে মনুষ্য নির্মিত তেমন কোন দর্শনীয় স্থান না থাকলেও সাগরের স্ফটিক স্বচ্ছ জলে ডুব-সাঁতার আর ছোট ছোট দ্বীপাবলীর সাদা বালির সৈকতে হাঁটতে হাঁটতে নিজেকে খুব সৌভাগ্যবান মনে হবে। প্রকৃতি এখানে নিজের মতোই সুন্দর। মানুষের তৈরি নকল সৌন্দর্য এখনো কম এই দেশটিতে। শুধুমাত্র রাজধানী মালেতেই নগর জীবনের মেকি চাকচিক্য আর কোলাহল লক্ষ্য করা যায়। বাকি বেশিরভাগ দ্বীপই পর্যটনের জন্য আদর্শ জায়গা। এখানকার প্রধান দ্বীপশহরগুলোর মধ্যে মালে, আদ্দু সিটি, কোভামওলা, কুলহোদুফুশি এবং তিনাদ্দু অন্যতম। ছোটখাটো দ্বীপগুলোতে গড়ে উঠেছে মনোরম সব রিসোর্ট এবং হোটেল। এসব হোটেল এবং রিসোর্ট খুব ব্যয়বহুল। ভাড়া প্রতিরাত ২ জনের জন্য ১৫০-৭০০ মার্কিন ডলার। তবে মালে সিটিতে হোটেল তুলনামূলক সস্তা। অভিজাত হোটেল এবং রিসোর্টগুলো ওয়াটার স্পোর্টস, নাইট ফিশিং, ফিট ইন দ্য ওয়াটার ব্রেকফাস্ট, ডুবো দ্বীপের মাঝখানে উঁচু জায়গায় মোমবাতি জ্বালিয়ে রোমান্টিক ডিনার অন দ্য টপ অব দ্য আইল্যান্ড এসবের ব্যবস্থা করে থাকে।

সকালে একটু দেরিতেই ঘুম ভাঙলো। হোটেলের ফ্রি ব্রেকফাষ্ট পেলাম না। তাই ধীরে সুস্থে বেরুলাম শহর ঘুরতে। প্রথমে গেলাম মালে হারবার-এ। খুঁজে পেতে সেখানে একটা মনোরম রেস্টুরেন্ট পেয়ে গেলাম। নাম সী-শেল। ফেরীর টিকেট কাউন্টারের উপর তলায় গড়ে ওঠা এই রেস্টুরেন্টের তিনদিকে খোলা। খেতে খেতে সাগরের সৌন্দর্য উপভোগ করা যায় এখান থেকে।

এদিক-ওদিক ঘুরে রেস্টুরেন্টে এসে বসতে দুপুর ১টা বেজে গিয়েছে। তাই ভাবলাম একবারে লাঞ্চ সেরে নিব। আসলে লাঞ্চ না বলে ব্রাঞ্চ বলাই ভাল, ব্রেকফাষ্ট আর লাঞ্চ মিলিয়ে ব্রাঞ্চ। খেয়ে-দেয়ে বিকালটা মালে শহরে ঘুরে বেড়ালাম সন্ধ্যা পর্যন্ত। মাঝে ১২০ রুফিয়াতে ফ্রি টক টাইমসহ সীম কার্ড কিনে নিলাম, সঙ্গে অতিরিক্ত ১০০ রুফিয়া রির্চাজ করে চালু করলাম ইন্টারনেট ডাটা সার্ভিস।

পুরো মালে সিটি আপনি হেঁটে বেড়িয়ে আসতে পারেন। বড়জোর ২ থেকে ৩ ঘণ্টা সময় লাগবে তাতে। তবে মালে শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলো দেখতে গেলে আপনাকে পুরো দিনটা সময় দিতে হবে। এখানে দেখার মধ্যে রয়েছে প্রেসিডেন্ট অফিস, পুরাতন প্রেসিডেন্ট প্যালেস, পার্লামেন্ট হাউজ, সেন্টার টম্ব, ফ্রাইডে মসজিদ, সুলতান পার্ক, ইসলামিক সেন্টার, ফিশ মার্কেট এবং স্থানীয় স্যুভেনির শপ। মালের অধিকাংশ রোড ওয়ান-ওয়ে। সবচেয়ে বড় রোডটির আয়তন চওড়ায় আনুমানিক ২০ ফুট মাত্র। স্থানীয় অধিবাসীরা মোটরসাইকেল ব্যবহারে বেশি অভ্যস্ত। মালদ্বীপ পুরোপুরি আমদানি নির্ভর একটি দেশ। ভারত, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে এরা খাদ্য সামগ্রী এবং প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আমদানি করে থাকে। এখানে নাই কোন ক্ষেত-খামার, গবাদিপশু কিংবা পোলট্রি ফার্ম। সবই তারা আমদানি করে বিদেশ থেকে।

  •  
  • সুন্দর ছোট্ট দ্বীপ হুলহুমালের সাদা বালির সৈকতে আমি এবং পরের ছবিতে স্থানীয় কয়েকজন যুবক ওয়াটার বাইক নিয়ে যাচ্ছে সাগরের দিকে।

তৃতীয় দিন ৪ রুফিয়াতে টিকেট করে ফেরীতে করে চলে এলাম হুলহোমালে (HULHUMALE)। এটি মালদ্বীপ সরকারের পরিকল্পিত এবং আধুনিক নকশায় তৈরি ভবন এবং রাস্তাঘাট সমৃদ্ধ একটি দ্বীপ। এই দ্বীপের রাস্তাগুলো দৃষ্টিনন্দন। দুপাশে ঝাউগাছ মাঝে ঝকঝ্কে পরিছন্ন পীচ ঢালা রাস্তা। কোথাও কোথাও সারি বেঁধে আবাসিক ভবন। কিছু উঁচু ভবনও রয়েছে এখানে। মালে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটি এই দ্বীপেরই একটা অংশে নির্মিত। এখানকার সাগরপাড়ে কিংবা ফেরীঘাটে বসে আপনি দেখতে পারেন সী-প্লেন সমূহের উড্ডয়ন-অবতরণ। সী-প্লেনের ঘাঁটিও এখানে। দূরবর্তী দ্বীপগুলোতে যাওয়া-আসা করা যায় এগুলোতে চড়ে। আকাশ থেকে মালদ্বীপের ফটোশ্যুট-এরও সুযোগ করে দেয় সী-প্লেনগুলো। এখানে কমপক্ষে ১০ জন বাংলাদেশী শ্রমিকের সঙ্গে দেখা হলো। কেউ দোকান, কেউ মসলা গুঁড়া করার কারখানা এবং কেউ শহর পরিচ্ছন্ন করার কাজে নিয়োজিত। তাদের সঙ্গে আলাপ করে জানলাম, তারা দেড় থেকে ২ লাখ টাকা খরচ করে এই দেশে এসেছে। কিন্তু সে হিসাবে বেতন খুব কম। গড়ে মাত্র ৮ থেকে ১৫ হাজার টাকা মাসিক বেতন তাদের।

সূর্য সাগরে ডুব দেয়ার আগেই দ্বীপ ছাড়লাম। ফিরে এলাম ইট-কংক্রিটের মালে শহরে। তখনো ঘুরে আসা শান্ত নিরিবিলি আর পরিচ্ছন্ন দ্বীপটি দেখার তৃপ্তি চোখে-মুখে।

পরদিন আবারো চষে বেড়লাম মালে সিটি। এবার পায়ে হেঁটেই বেড়ালাম অনেকটা পথ। সাগর পাড়ে বসে পোড়া মরিচের গুঁড়ো সহযোগে নারিকেল খেতে বেশ অন্যরকম লাগল।

একটু সকাল-সকালই ঘুম থেকে উঠে গেলাম। ঝটপট নাস্তা সেরে বেরিয়ে পড়লাম এয়ারপোর্টের উদ্দেশে। কারণ সকাল ৯টায় আমার মালে কলম্বো ফ্লাইট। টিকেট কেটে ঝটপট চড়ে বসলাম ফেরীতে। সাগরের বুক চিরে ছুটে চলেছে ফেরী। পেছনে ধীরে ধীরে মালে শহরের দৃষ্টিনন্দন ভবনগুলো ছোট আর ঝাপসা হতে লাগলো। মাত্র কদিনের এই ভ্রমণে শহরটিকে বেশ আপন করে নিয়েছিলাম। গণ্ডীছাড়া হয়ে ঘুরে বেড়িয়েছি শহরময়। এখন থেকে সেসব স্মৃতির খাতায় জমা হয়ে থাকবে। বিদায় মালে, বিদায় সৌন্দর্যের রানি মালদ্বীপ।

Please follow and like us:
0

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

CAPTCHA


error: Content is protected !!