মংপুতে রবীন্দ্রনাথ

রবীন্দ্র-স্নেহধন্যা ও লেখিকা মৈত্রেয়ী দেবী বিয়ের পরেই স্বামীর সঙ্গে চলে আসেন মংপু। তাঁর স্বামী ডঃ মনোমোহন সেন ছিলেন বিজ্ঞানী, কাজ করতেন সিঙ্কোনা প্ল্যান্টেশনের গবেষণাগারে।

রবীন্দ্রনাথ ১৯৩৮ সালে প্রথম আসেন মংপুতে। সেবারে কবি এসেছিলেন কালিম্পং। মৈত্রেয়ী দেবী তাঁকে আমন্ত্রণ পাঠালেন মংপুতে আসার জন্য। তিস্তার পাশে রাম্ভি থেকে একটা রাস্তা উঠে এসেছে মংপুর দিকে। সেই রাস্তাতেই এসেছিলেন কবি।

রবীন্দ্রনাথ ১৯৩৮ সাল থেকে ১৯৪০ সালের মধ্যে মোট চার বার মংপু এসেছেন। যখনই এসেছেন, মৈত্রেয়ী দেবীর যত্ন-আত্যিতে দেড়-দু’মাস কাটিয়ে গেছেন ৷ পাহাড় ভালোবাসতেন কবি। সেই কিশোরবেলায় পিতার সঙ্গে আলমোড়া ভ্রমণের ভ্তির দিয়েই তাঁর পাহাড়কে প্রথম ভালোবাসা। প্রকৃতির অকৃপণ সৌন্দর্য ও বিস্তৃত পাহাড়- জঙ্গল দিয়ে ঘেরা নির্জন মংপু তাঁকে জীবনের শেষ প্রান্তসীমায় বারবার টেনে নিয়ে এসেছিল।

মংপুতে থাকার সময় অনেক কবিতা-গান লিখেছেন তিনি৷ মৈত্রেয়ী দেবী ‘‘মংপুতে রবীন্দ্রনাথ” বইয়ে বিশ্বস্ত লিপিকরের মতো ধরে রেখেছেন রবীন্দ্রনাথের দিনলিপি ও প্রতিটি কথাবার্তা ৷ ১৯৪০ সালে শেষবার কবি যখন আসেন, তাঁর অবস্থানের সময়ই ২৫শে বৈশাখ এসে যায়। স্থানীয় নেপালি অধিবাসীদেরকে ডেকে তাদের মাঝে কবির জন্মদিন পালন করা হয়। মৈত্রেয়ী দেবী মংপুতে রবীন্দ্রনাথ গ্রন্থে তার বিবরণ দিয়েছেন – “পঁচিশে বৈশাখের দুতিন দিন আগে একটা রবিবার (২২ বৈশাখ) এখানে উৎসবের বন্দোবস্ত হোলো। সকালবেলা দশটার সময় স্নান করে কালোজামা কালো রং-এর জুতা পরে বাইরে এসে বসলেন (গুরুদেব)। কাঠের বুদ্ধমূর্তির সামনে বসে একজন বৌদ্ধ স্তোত্র পাঠ করল। কবি ঈশোপনিষদ থেকে অনেকটা পড়লেন। সেইদিন দুপুরবেলা জন্মদিন বলে তিনটে কবিতা লিখেছিলেন, তার মধ্যে বৌদ্ধবৃদ্ধের কথা ছিল। বিকেলবেলা দলে দলে সবাই আসতে লাগল- আমাদের পাহাড়ী দরিদ্র প্রতিবেশী, সানাই বাজতে লাগল, গেরুয়া রং-এর জামার উপর মাল্য-চন্দন ভূষিত আশ্চর্য স্বর্গীয় সেই সৌন্দর্য সবাই স্তব্ধ হয়ে দেখতে লাগল। ঠেলা চেয়ারে বসে বাড়ির পথ দিয়ে ধীরে ধীরে ওঁকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, দলে দলে পাহাড়ীরা প্রণত হয়ে ফুল দিচ্ছিল। প্রত্যেকটি লোক শিশু বৃদ্ধ সবাই কিছু না কিছু ফুল এনেছে। ওরা যে এমন করে ফুল দিতে জানে, তা আগে কখনও মনে করিনি।”

আমি দার্জিলিংয়ে চাকরির সূত্রে মংপুর এই বাড়িটিতে বহুবার গেছি। এখানে সাজানো ছিলো রবীন্দ্রনাথের ব্যবহৃত শোওয়ার খাট, লেখার ডেস্ক, রংয়ের প্যালেট, বায়োকেমিক ওযুধের শিশি এবং দুষ্প্রাপ্য বহু ছবি ৷ তুলিতে মাখানো শুকনো রঙ দেখে শিহরন জাগত, মনে হতো, রবীন্দ্রনাথ যেন ছবি আঁকতে আঁকতে উঠে গেছেন, একটু পরে ফিরে এসে আবার বসবেন।

শিশির রাউত নামে এক নেপালী যুবক সেসব আগলে রাখত সযত্নে। পর্যটকেরা এলে তাদেরকে বাড়িটা ঘুরিয়ে দেখাত, শুদ্ধ বাংলায় রবীন্দ্রনাথের কবিতা আবৃত্তি করে শোনাত। একটা ক্যামেলিয়া গাছ দেখিয়ে বলত, এই গাছটা দেখেই রবীন্দ্রনাথ নাকি ‘ক্যামেলিয়া’ কবিতাটি লিখেছেন (কিন্ত তার পক্ষে জানা সম্ভব ছিলো না, রবীন্দ্রনাথ মংপু আসার ৬ বছর আগেই ক্যামেলিয়া কবিতাটি লিখে ফেলেছিলেন !)

রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার জেরে এই ঐতিহাসিক বাড়িটি নষ্ট হতে বসেছিল। শেষপর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গ সরকারের উদ্যোগে এখানে সংস্কার কার্য চলছে। এবছর এপ্রিলে যখন এখানে যাই, তখন বাড়িটিতে সিমেন্ট ও রঙের কাজ চলছে।

বাড়িটির বাইরে এবার একটা গেট খাড়া হয়েছে। আমার চমক লাগল, যখন দেখলাম সেই শিশির রাউত গেটে প্রহরার দায়িত্বে। তার চেহারাও মলিন হয়েছে, শরীরে বার্ধক্যের ছাপ। শিশিরবাবু আমাকে চিনতে পারলেন ও গভীর বিষণ্ণতার সঙ্গে বললেন, “অনুভূতি আর নেই।” তাকে গেটে দারোয়ানের কাজ দেওয়াতে রবীন্দ্রপ্রেমী মানুষটি খুব দুঃখে আছেন, বোঝা গেল।

তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, রবীন্দ্রনাথের ব্যবহৃত জিনিস ও ফোটোগ্রাফগুলো কোথায়?

  • – অফিসারেরা হয়তো কোথাও সরিয়ে রেখেছেন।
  • – একটা ভিজিটর্স বুক ছিলো, যাতে প্রতিমা দেবীর স্বাক্ষর করা মন্তব্য ছিলো। সেটা কোথায় ?
  • – ওটা যত্ন করে রাখা আছে আমার কাছেই।
  • এবার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল শিশির রাউতের।
Please follow and like us:
0

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

CAPTCHA


error: Content is protected !!