হিমাচলের স্পিতি উপত্যকার ছোট্ট গ্রাম গিউ

নবীন লামাকে অনুরোধ করতেই সে ওই প্রাচীন লামার পাশে বসে পড়ল ছবি তোলার জন্য

সিমলা থেকে চলেছি সারাহান-সাংলা-কল্পা-নাকো-টাবো-কাজার দিকে। নাকোতে রাত্রিবাস করার পরে সকালে উঠে যাত্রা শুরু করলাম  টাবোর দিকে।

মাঝপথে পথে সুমদো নামে একটি জায়গায় – ডান দিকে একটা বোর্ড দেখলাম , গিউ ভিলেজ । সেদিকে ঘুরে ১২ কিলোমিটার পাহাড়ি পথে পাথরের উপর দিয়ে লাফাতে লাফাতে চলল আমাদের গাড়ি। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১০ হাজার ফুট উচ্চতায় এই গ্রাম। মাত্র ১২-১৪টি বাড়ি সেই গ্রামে।

এই গ্রামে আছে এক বৌদ্ধ লামা-র ৫০০ বছরের পুরোনো মমি। লামা-র নাম সাংঘা তেনজিং । অনশনে প্রাণত্যাগ করেন তিনি। বৌদ্ধধর্মে টানা উপবাসের মধ্য দিয়ে উপাসনা একটি পরিচিত ধর্মাচার। সাংঘা তেনজিং অনশনে থেকে একসময় মারা যান।

তাঁর সেই দেহ কালক্রমে স্বাভাবিক পদ্ধতিতে মমিতে রূপান্তরিত হয়েছে। এর জন্য তাঁর শরীরে কোনও রাসায়নিক প্রয়োগ করতে হয়নি। অনশনের দেহে কোনও পচনও হয়নি। মমির দাঁত ও মাথার চুল আছে। লোকেরা বলে, মমির চুল নাকি বাড়ে। অবশ্য সেই কাহিনীর সত্যাসত্য বিচার করা হয়নি।

এই লামা ছিলেন গেলুগা-পা সম্প্রদায়ের। লামা তাঁর সাধনার উচ্চতম স্তরে পৌঁছে গেছিলেন, সেই স্তরের নাম ‘জোগচেন’, যেখানে তিলমাত্র খাদ্য-পানীয় সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে যায়। খরা, দুর্ভিক্ষ ও সব প্রাকৃতিক দুর্বিপাক থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করার জন্যেই এই সাধনা। উপবাস একসময় তাঁকে নির্বাণলাভে পৌঁছে দেয়। বলা হয়, এই শীতল আবহাওয়ায় ক্রমাগত উপবাসের ফলে তাঁর শরীরে কোনও জলীয় পদার্থ ছিলো না এবং কোনও জীবাণুও বেঁচে থাকতে পারেনি। ফলে দেহের পচন হতে পারেনি।

চীন যখন তিব্বতের দখল নেয়, তখন তিব্বতের বিভিন্ন মনাস্ট্রিতে ৩০০০ মমি ছিলো। চিনারা সেগুলো পুড়িয়ে নষ্ট করে দেয়।

১৯৭৫ সালে এক ভয়াবহ ভূমিকম্পে পুরো গিউ গ্রাম ধ্বংস হয়ে যায়। তখন ইন্দো-টিবেটান সীমান্ত বাহিনী সেই ধ্বংসাবশেষ সরাতে গিয়ে মমিটিকে উদ্ধার করে। মমিটি গ্রামের মনাস্ট্রিতেই ছিলো, বাইরের লোকেরা জানত না। ভূমিকম্পের ফলে সেনাবাহিনীর মাধ্যমে বহির্জগতের লোকেরা জানতে পারে।

মমিটিকে কিছুদিন গ্রামের মধ্যেই রাখা হয়েছিল। এখন একটা ন্যাড়া পাহাড়চূড়ায় একটি নতুন গুম্ফা বানিয়ে তার মধ্যে কাচের বাক্সে সেটিকে রাখা হয়েছে ।

সেই পাহাড়ে ধাপে ধাপে সিঁড়ি কেটে রাখা হয়েছে। তার উপরে উঠলে হু হু হাওয়ার তীব্রতা । মনে হচ্ছে আমাদেরকে ধাক্কা মেরে নিচে ফেলে দেবে।

আমার স্ত্রী তো ভয়েই মাঝপথ থেকে ফিরে গেলেন। আমি সাহসে ভর দিয়ে উপরে উঠলাম।

একটি তরুণ লামা সেই কাঁচের বাক্সের দেখাশোনা করে। সে তালা লাগিয়ে নিচে নেমে যাচ্ছিল। বেচারা সারাদিন মৃতের সঙ্গে থাকতে ক্লান্তি বোধ তো করতেই পারে ! আমাকে দেখে সে ঘরের দরজা খুলে দিলো। খুব ছোট একটি ঘর, তার মধ্যে কাঁচের বাক্সে বসে আছেন ৫০০ বছরের লামা ! অনেক দর্শনার্থী সেই কাঁচের ভেতরে টাকা রেখে গেছে।

পাশেই একটি মনাস্ট্রি তৈরি হচ্ছে, সেটাতে রঙের প্রলেপ পড়লে লোকজনের ভিড়ও বাড়বে একসময়।

Please follow and like us:
0

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

CAPTCHA


error: Content is protected !!