বুড়িগঙ্গার পুরোনো জাহাজ

কদিন আগে ফটোগ্রাফির ক্লাসে একজন শিক্ষক দেখিয়েছিলেন প্রাচীন ঢাকার দুর্লভ কিছু ছবি। সেখানে একটি ছবি ছিল সদরঘাটের, যাতে স্যার ফুলার’কে বহনকারী একটি জাহাজ সদরঘাটে এসে নোঙ্গর করেছে এমন। সেই ছবি দেখিয়ে শিক্ষক আক্ষেপ করে বলেছিলেন দেখছেন বুড়িগঙ্গার পানি কি সুন্দর ছিল যেন গ্লাসে করে খাওয়া যায়, আর নদীর ঐপারটায় কি সুন্দর গ্রাম, দেখলেই যেন প্রাণ জুড়িয়ে যায়।

ফটোগ্রাফী শিখছেন এমন ফটোগ্রাফারদের ছবি তোলার এক উৎকৃষ্ট জায়গা পুরান ঢাকা, বিশেষ করে সদরঘাট ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকা। বলা হয়ে থাকে এখানে নাকি ছবি তোলার অনেক সাবজেক্ট গিজগিজ করে। সে বিশ্বাস নিয়ে শুক্রবার দেখে একদিন ক্যামেরা হাতে আমিও বেরিয়ে পড়ি সাবজেক্টের খোঁজে। একদিন বুড়িগঙ্গার বাদামতলি ঘাটে দেখা মেলে এমন জাহাজের যা দেখতে অনেকটা ছবিতে দেখা জাহাজের মতো। তবে এ জাহাজের দু’পাশে প্রপেলার আছে এটাই যা তফাৎ। জাহাজটির নাম পি.এস. লেপচা (P.S.LEPCHA) আমাদের দেশের স্থলভাগে ঘুরে ঘুরে আপনি হয়তো বৃটিশ শাসনামলে নির্মিত বহু স্থাপত্যশৈলি দেখেছেন কিন্তু সেই সময়কালে নির্মিত কোন নৌযান কি দেখেছেন? পি.এস লেপচা নির্মিত হয় ১৯৩৮ সালে কলকাতায়। লেপচা যাত্রী পরিবহণ করে। সদরঘাট হয়ে চাঁদপুর, বরিশাল হয়ে খুলনা পর্যন্ত এর গন্তব্য আবার এ পথেই ফিরে আসে। সাধারণত সদরঘাটের দূরপাল্লার যাত্রীবাহী নৌযানগুলো সাদা রঙের হয়। লেপচা মেটে গোলাপী রঙের (জাহাজের লোকেরা বলেন জাপা রং)। এছাড়া ওগুলো তিন তলা হয় আর লেপচা দোতলা। অন্যান্য নৌযানের সাথে লেপচার প্রধানতম পার্থক্যটা যদি বড় করে বলি তাহলে বলতে হয়, আপনি পোস্তগোলা ব্রিজের উপর দাঁড়িয়ে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বুড়িগঙ্গা নদী দিয়ে যতায়াত করা নৌযানগুলো দেখেন তবে বিকেল নাগাদ কেবল একটি নৌযানই দেখবেন যার দু’পাশে ইঞ্জিনের দুই পাখা ঘুরে ঘুরে একে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আর এটিই হচ্ছে প্যাডেল স্টীমার। যদিও ষ্টীমে নয় ডিজেল ইঞ্জিনে চলে এটি।

বিআইডব্লিওটিএর মালিকানাধীন এমন আরো তিনটি প্যাডেল ইঞ্জিন চালিত জাহাজ রয়েছে। এগুলো হচ্ছে P.S.TERN, P.S.OSTRICH, P.S.MAHSUD স্টিমারগুলো কাছাকাছি সময়ে নির্মিত। পি.এস মাহসুড নির্মিত হয় ১৯২৮ সালে, পি.এস অসট্রিচ নির্মিত হয় ১৯২৯ সালে এবং পি.এস টার্ন নির্মিত হয় ১৯৩৫ সালে। মজার ব্যাপার হলো চারটি জাহাজই কলকাতায় নির্মিত এবং সমগ্র ভারতেও বর্তমানে এমন জাহাজ নেই। জাহজগুলো স্টীম ইঞ্জিন থেকে ডিজেল ইঞ্জিনে রূপান্তর করা হয় ৮০’র দশকে।

গত একযুগে যত নৌ-দুর্ঘটনা হয়েছে এর বেশিরভাগই হয়েছে ঝাড়ো বাতাসের চাপে লঞ্চ কাত হয়ে, উল্টে গিয়ে, অধিক যাত্রী বোঝাইয়ের কারণ তো রয়েছেই। লঞ্চ কাত হয়ে ডুবলে খুব কম যাত্রীই ঝাঁপ দিয়ে বাঁচতে পারে কারণ লঞ্চ কাত হয়ে খুব দ্রুত ডোবে, আর ঝাঁপ দিয়ে বাঁচার সম্ভাবনাও কম। সাধারণ যাত্রীবাহী লঞ্চ আগাগোড়া সমান চওড়া থাকে, কোন কোন ক্ষেত্রে চওড়া অনুপাতে উচ্চতা বেশি হয় এদুটি কারণে ঝড়ো বাতাস চাপ যেকোন একদিকে চাপ সৃষ্টি করে প্রবলভাবে, এতে নৌযান অপরদিকে কাত হয়ে পড়ে। অন্যদিকে প্যাডেল-চালিত জাহাজগুলোর কাঠামো নৌকোর সাথে তুলনা করা চলে। নৌকোর মতো এর সামনে ও পেছনের দিক সরু আর পেট অর্থাৎ মাঝখান বরাবর অধিক চওড়া। নৌকো মাটির উপর উল্টো করে রাখলে যেমন হয় এর ছাদটিও তেমন অর্ধডিম্বাকৃতির এবং এর উচ্চতাও কম এতে করে ঝড়ো বাতাসের চাপ কোনোভাবেই এর কোনো দিকে চেপে বসতে পারে না সুতরাং বাতাসের চাপ যতই হোক একে কাত করা সম্ভব নয়। আর এভাবেই এই জাহাজগুলো এতবছর ধরে বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়িয়ে চলতে সক্ষম হয়েছে।

বৃটেনের একটি দাতব্য সংস্থা ঐ দেশের প্রাচীন প্যাডেল স্টিমার সংরক্ষনে কাজ করে। এটি Paddle Steamer Reservation Societ নামে পরিচিত। যা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৫৯ সালে। এই সোসাইটির মালিকানাধীন দুটি প্যাডেল জাহাজকে ঐ দেশের সরকার জাতীয় ঐতিহাসিক নৌযানের তালিকায় অন্তর্ভূক্ত করেছে এবং জাতীয় গুরুত্ব¡পৃর্ণ নৌযান হিসেবে ঘোষনা করেছে। এর একটি P.S. Waverley যেটি নির্মিত হয় ১৯৪৬ সালে এবং P.S. King swear Castle যেটি নির্মিত হয় ১৯২৪ সালে।

আমেরিকান সরকার তাদের প্রাচীন দুটো প্যাডেল ইঞ্জিন-চালিত জাহাজকে জাতীয় ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা দিয়ে বিশ্রামে পাঠিয়েছে। এর একটি P.S. Belle of Louise ville নির্মিত হয় ১৯১৪ সালে এবং আরটি P.S. William M. Black নির্মিত হয় ১৯৩৪ সালে। এরমধ্যে P.S. William M. Black কে একটি ভাসমান নৌ-জাদুঘর হিসেবে রাখা হয়েছে।

পর্যটকরা প্রায়ই সদরঘাট আসেন প্যাডেল স্টীমার দেখতে এবং এর ছবি তুলে নিয়ে যান। তারা চালকদের সাথে কথা বলেন এবং বলে যান এসব জাহাজ যেন আমরা সংরক্ষণ করি এবং আরো অনেক দিন চালু রাখি। শুধু পর্যটকরা কেনো আমাদেরও অন্তরের চাওয়া যে এটি। যুগ যুগ ধরে ওরা চলুক এই বুড়িগঙ্গায়, বরিশালের কীর্তনখোলায়, খুলনার রূপসায়। স্যার ফুলারকে বহনকারী জাহাজের অনুরূপ একটি জাহাজ কদিন আগে পর্যন্ত বুড়িগঙ্গা নদীতেই ছিল। সদরঘাট থেকে আরো সামনে এগিয়ে পাগলার ভিআইপি জেটিতে মেরিএন্ডারসন নামে সে জাহাজটি একটি ভাসমান রেস্তোরা হিসেবে চালু ছিল। জাহাজটি ২০১৪ সালের ১৫ই অক্টোবর সর্টসার্কিটের আগুনে পুড়ে সম্পূর্ন ধ্বংস হয়ে যায়। এই জাহাজটিও কলকাতায় নির্মিত হয় ১৯৩৫ সালে। বাংলাদেশ সরকার এর মলিকানা পায় স্বাধীনতার পরে। বঙ্গবন্ধু স্বধীনতার পরে পর্যটন কর্পোরেশনের কাছে জাহাজটি হস্তান্তর করেছিলেন। ৮০র দশক ও ৯০র দশকের বহু বাংলা সিনেমাতে এই ভাসমান রেসটোরাটি দেখা যায় । দেশের প্যাডেল স্টীমারগুলোর ইঞ্জিন এখনও ভীষণ শক্তিশালী । যদিও জাহাজগুলোর অবয়বে জীর্নতার ছাপ স্পষ্ট। গত জুলাই মাসে বড় লঞ্চের সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষে পি এস মহসুদ ভীষনভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়, ঘটনাস্থলে ৬ জন নিহত হয়। জাহাজটি এরপরে সংস্কার হয়েছে কিনা জানা নেই। তবে সবকটি জাহাজের সংরক্ষণ এখন ভীষণভাবে জরুরি। বয়সের বিচারে জাহাজ চারটিকে যাত্রী পরিবহন থেকে সরিয়ে রাখা উচিত। যাত্রীদের জন্য নতুন জাহাজ চালু করে এই স্টীমারগুলোকে শুধুমাত্র বিশেষ নদী ভ্রমনের জন্য রাখা উচিৎ। সরকারি অনুষ্ঠানে নদীভ্রমণ আযোজনে এই জাহাজগুলোকে বেছে নেওয়া হয়। এই জাহাজে যাত্রী হয়েছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ বর্তমান ও পূর্বের রাষ্ট্রপতি, মন্ত্রী, এমপি, সচিব এবং সরকারি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো চাইলে নির্দিষ্ট দিনে ভ্রমণের জন্য এই জাহাজ ভাড়া নিতে পারেন। আর এজন্য বুকিং দিতে হবে বাবুবাজারের বাদামতলীর স্টিমার ঘাটে বিআইডব্লিউটি-এর বুকিং অফিসে। এছাড়াও বিআইডব্লিউটি-এর মতিঝিল অফিস থেকেও বুকিং নেওয়া যেতে পারে।

Please follow and like us:
0

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

CAPTCHA


error: Content is protected !!