বাংলাদেশের ঐতিহ্য দিনাজপুরের কান্তজীর মন্দির

উত্তরবঙ্গে বেড়াতে গেলে কোথায়  ঘুরবেন? এই ভাবনাটা মাথায় আসতেই প্রথমে হয়তো আপনার মনে হবে কান্তজি মন্দিরটাই আগে দেখে ফেলা উচিত। এই মন্দিরটি ১৮ শতকে নির্মিত একটি চমৎকার ধর্মীয় স্থাপনা। এত কারুকার্যময় স্থাপত্য আমাদের দেশে খুব কমই আছে। কান্তজি মন্দির ছাড়া বাংলাদেশে আরো অনেক হাজার বছরের ঐতিহ্যমন্ডিত নিদর্শন আছে , যেগুলো আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্যের সাক্ষ্য বহন করে। কিন্তু কান্তজি হলো এমন একটি স্থাপত্য যেটি আপনাকে শুধু এই অঞ্চলের ইতিহাসই নয়, একই সঙ্গে হিন্দুধর্মের পৌরাণিক জগতেও  নিয়ে যাবে।

১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দে ভূমিকম্পে চূড়াগুলো ভেঙে যাওয়ার আগে মন্দিরটি দেখতে এরকম ছিল

এবার কান্তজির মন্দির সম্পর্কে কিছু তথ্য দেয়া যাক।

কান্তজির মন্দির দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার সুন্দরপুর ইউনিয়নে টেপা নদীর তীরে অবস্থিত ।  দিনাজপুর শহর থেকে মাত্র ১৪ মাইল উত্তরে।  কান্তনগর নামে পরিচিতি এই এলাকার কোল ঘেঁষে বয়ে গেছে নদী, গাছপালা, সাঁওতাল ও শহুরে মানুষের মিশ্রণে এখানে গড়ে উঠেছে ভিন্নমাত্রার পরিবেশ।

মন্দিরটি হিন্দু ধর্মের কান্ত বা কৃষ্ণের মন্দির হিসেবে পরিচিত যা লৌকিক রাধা-কৃষ্ণের ধর্মীয় প্রথা হিসেবে বাংলায় প্রচলিত। ধারণা করা হয়, মহারাজা সুমিত ধর শান্ত এখানেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন।

মন্দিরের উত্তর দিকের ভিত্তিবেদীর শিলালিপি থেকে জানা যায়, তৎকালীন দিনাজপুরের মহারাজা জমিদার প্রাণনাথ রায় তাঁর শেষ বয়সে মন্দিরের নির্মাণ কাজ শুরু করেন। ১৭২২ খ্রিস্টাব্দে তাঁর মৃত্যুর পরে তাঁর শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী তাঁর পোষ্যপুত্র মহারাজা রামনাথ রায় ১৭৫২ খ্রিস্টাব্দে মন্দিরটির নির্মাণ কাজ শেষ করেন। শুরুতে মন্দিরের চূড়ার উচ্চতা ছিলো ৭০ ফুট। ১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দে মন্দিরটি ভূমিকম্পের কবলে পড়লে এর চূড়াগুলো ভেঙে যায়। মহারাজা গিরিজানাথ মন্দিরের ব্যাপক সংস্কার করলেও মন্দিরের চূড়াগুলো আর সংস্কার করেননি।

মন্দিরটি ওপরের দিকে তিন ধাপে উঠে গেছে । মন্দিরের চারদিকের সবগুলো খিলান দিয়েই ভেতরের দেবমূর্তি দেখা যায়। মন্দির প্রাঙ্গণ আয়তাকার হলেও, পাথরের ভিত্তির ওপর দাঁড়ানো ৫০ ফুট উচ্চতার মন্দিরটি বর্গাকার। মন্দিরের ভিত্তিমূলের দৈর্ঘ্য ৬০ ফুট ৩ ইঞ্চি। ভূমি সমতল থেকে ভিত্তিভূমির উচ্চতা ৩ ফুট। মেঝেতে ওঠার জন্য দুই পাশে পাঁচধাপ বিশিষ্ট সিঁড়ি আছে। মন্দির ভবনের দেয়ালের দৈর্ঘ্য ৫২ ফুট এবং আয়তন ৩ হাজার ৬০০ ফুট। নিচতলার সব প্রবেশপথে বহু খাঁজযুক্ত খিলান রয়েছে। দুটি ইটের স্তম্ভ দিয়ে খিলানগুলো আলাদা করা হয়েছে, স্তম্ভ দুটো খুবই সুন্দর এবং সমৃদ্ধ অলংকরণযুক্ত। মন্দিরের পশ্চিম দিকের দ্বিতীয় বারান্দা থেকে সিঁড়ি ওপরের দিকে উঠে গেছে। মন্দিরের নিচতলায় ২১টি এবং দ্বিতীয় তলায় ২৭টি দরজা-খিলান রয়েছে, তবে তৃতীয় তলায় রয়েছে মাত্র তিনটি করে।  বেশ কয়েকটি ধাপ ও চূড়াবিশিষ্ট এই মন্দিরটির নির্মাণরীতি মধ্যযুগীয়।

মন্দির দেয়ালের অসাধারণ টেরাকোটা

মন্দিরের গায়ে অপরূপ টেরাকোটার জন্য কান্তজির মন্দির বিখ্যাত।  পুরো মন্দিরে প্রায় ১৫ হাজারের মতো টেরাকোটা টালি রয়েছে।  আপনি মন্দিরের এপাশ-ওপাশ ঘুরে বিস্মিত হয়ে আবিষ্কার করবেন, এই টেরাকোটাগুলোর একটা সঙ্গে অন্যটার কোনো মিল নেই।  বরং টেরাকোটার চিত্রগুলো একে একে বর্ণনা করছে একেক গল্প। এসব পোড়ামাটির ফলকে মধ্যযুগের শেষদিকে বাংলার সামাজিক জীবনের নানা কাহিনী বিবৃত রয়েছে, উৎকীর্ণ হয়েছে রামায়ণ, মহাভারত ও বিভিন্ন পুরাণের কাহিনীর অংশ। সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর ও কলি এ চারটি শাস্ত্রীয় যুগের পৌরাণিক কাহিনীগুলো মন্দিরের চার দেয়ালে চিত্রায়িত। তাই বৈদিক চিত্রকাহিনী সংবলিত টেরাকোটায় আচ্ছাদিত মন্দিরটি দেখলে মনে হবে এ যেন চার খণ্ডে শিল্পখচিত এক পৌরাণিক মহাকাব্যের দৃশ্যমান উপস্থাপনা।  উপরের সমান্তরাল প্যানেলে সূক্ষ্ম জটিল অলঙ্করণের মাঝে প্রস্ফুটিত গোলাপ ছিল যা সাধারণভাবে ষাটগম্বুজ মসজিদ, বাঘা মসজিদ, কুসুম্বা মসজিদ ও ছোট সোনা মসজিদ প্রভৃতির গায়ে লক্ষ্য করা যায়।

এ মন্দিরের টেরাকোটা আপনাকে কখনো নিয়ে যাবে মধ্যযুগীয় বাংলায়, আবার কখনো উপস্থাপন করবে পৌরাণিক কাহিনী।  একটা স্থাপত্য আপনার ভেতরে কতখানি প্রভাব ফেলতে পারে তা কান্তজির মন্দিরে না গেলে আপনি ধারণা করতে পারবেন না।

প্রতিবছর নভেম্বর মাসে কান্তজি মন্দির প্রাঙ্গণে আয়োজন করা হয় রাশ পূর্ণিমা মেলার। মাসব্যাপী এই মেলায় ভিড় জমান অসংখ্য দর্শনার্থী আর পুণ্যার্থী। রাশ পূর্ণিমা উপলক্ষে তখন দিনাজপুরের রাজবাড়ি থেকে কান্তজি বিগ্রহ নিয়ে আসা হয় মন্দিরে।  স্থাপত্য রীতি, গঠনবিন্যাস, শিল্পচাতুর্য মন্দিরটির সামগ্রিক দৃশ্যকে এতই মাধুর্যমণ্ডিত করে তুলেছে যে এর চেয়ে সুন্দর, নয়নাভিরাম মন্দির বাংলাদেশে দ্বিতীয়টি নেই।

 

Please follow and like us:
0

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

CAPTCHA


error: Content is protected !!