ফয়স লেকের স্বচ্ছ জলে

চট্টগ্রাম শহরের হাজারো কোলাহলের ভেতরেই মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশে ফয়স লেকের অবস্থান। ফয়স লেক প্রাকৃতিক বৈচিত্রে, সংরক্ষিত সবুজে রয়েছে নানারকম গাছ আর পাহাড়। এখানকার বিভিন্ন পাহাড়ের মধ্যে রয়েছে অরুণিমা, জলটুঙ্গি, গোধূলি, অস্তাচল, আকাশমনি, হিমঝুরি, আসমানি, গগনদ্বীপ, উদয়ন প্রভৃতি। এসব পাহাড়ে নানা প্রজাতির গাছগাছালির মধ্যে রয়েছে সেগুন, গর্জন, কড়ই, কৃষ্ণচূড়া, সোনালু, কদবেল, পাম ও বাদাম। সব বয়সী মানুষের জন্য চট্টগ্রামের অন্যতম বিনোদন কেন্দ্র ফয়স লেক হ্রদকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। পরিবার, বন্ধু-বান্ধব নিয়ে অবসর সময়ে বেড়ানো, পিকনিক অথবা কর্পোরেট অনুষ্ঠানের জন্য অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান ফয়স লেক। কারণ এখানে রয়েছে আধুনিক সকল সুযোগ-সুবিধা আর পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা।

৩৩৬ একর জমিতে গড়ে ওঠা আকর্ষণীয় এই বিনোদন কেন্দ্র দুভাগে বিভক্ত। অ্যামিউজমেন্ট পার্ক ও ওয়াটার পার্ক সী-ওয়ার্ল্ড। অ্যামিউজমেন্ট পার্ক সাজানো হয়েছে অনেকগুলো রাইড নিয়ে। শিশু ও বড়দের জন্য আছে ভিন্নভিন্ন রাইডস্। রাইডগুলোতে ভ্রমণের পরিপূর্ণ আনন্দ পাওয়া যায়। উল্লেখযোগ্য রাইডসগুলোর মধ্যে ফেইরিস হুইল, বাম্পার কার, ফ্যামিলি রোলার কোস্টার, পাইরেটশিপ। ফেইরিস হুইলে উঠলে এক চক্করে দেখা যাবে ফয়স লেক এ্যামেউজমেন্ট ওয়ার্ল্ড। বাম্পার কার চড়ে আরেক জনের কারে ধাক্কা দেয়ার প্রতিযোগিতা চলে। মনে হবে যেন এক মজার যুদ্ধে নেমেছে সবাই। ফ্যামিলি রোলার কোস্টার এক সঙ্গে অনেকে উপভোগ করা যায়, দ্রুত গতিতে ফ্যামিলি রোলার কোস্টার ছাড়লে চিৎকারে মুখরিত হয়ে ওঠে পার্ক। এরপরেই দেখা মিলবে পাইরেটশিপ। বাচ্চাদের জন্য ফয়স লেক এ্যামেউজমেন্ট ওয়ার্ল্ড যেন এক স্বপ্নরাজ্য। সাজানো-গোছানো এই্ জায়গাতে শিশুরা স্বাধীনমতো ছুটোছুটি করতে পারে। শিশুদের আনন্দ বিনোদনের জন্য সবরকম উপকরণ আছে এখানে। বাচ্চাদের রাইডস্গুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, বেবি-কেরাওসাল, ট্রেন, দোলনা ইত্যাদি। ঝিকঝিক শব্দে চলা সার্কাস ট্রেন, বেবি কেরাওসালের নানা রঙের ঘোড়ায় চড়ে মজা পায় শিশুরা। এই কমপ্লেক্স-এর ভিতরেই রয়েছে সিঁড়িবেয়ে পাহাড়ে ওঠার ব্যবস্থা। অনেকগুলো সিঁড়ি বেয়ে উঠে দেখা মিলবে অনন্য সুন্দর এক পিকনিক স্পট যা ফটোকর্ণার নামে পরিচিত। সিঁড়ি বেয়ে এখানে ওঠার পরে অনেকেই হাঁপিয়ে ওঠেন। তারপরও কোন সমস্যা নেই, কারণ এখানে রয়েছে পানি ও ড্রিংসের সুব্যবস্থা। ফটোকর্নার থেকে কিছু দূর এগুলেই দেখা যাবে অবজারভেশন টাওয়ার আর এখান থেকে দূরবীনের সাহায্যে দেখা যাবে চট্টগ্রাম শহর। পিজন স্কয়ারে খাবার ছিটালে পার্কের কবুতরগুলো উড়ে এসে বসে দর্শনার্থীদের গায়ে। হ্রদের পাশেই নানা রকম সামুদ্রিক প্রাণীর ভাস্কর্য দিয়ে সাজানো হয়েছে এ্যাকোয়াটিক জোন যা পিকনিক স্পট হিসেবে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। নৌ-ভ্রমণের জন্য রয়েছে সুব্যবস্থা। কেউ চাইলে প্যাডেল বোট, ইঞ্জিনবোট কিংবা স্পিডবোট নিয়ে ঘুরতে ঘুরতে দেখতে পাবেন সংরক্ষিত সবুজ বন, বুনো খরগোশ আর হরিণের ছুটে চলা। সন্ধ্যার মৃদু আলোতে হ্রদের পাড় আড্ডায় মুখরিত হয়ে ওঠে। কারণ এখানে পাওয়া যায় কাবাব, চটপটি, ফুসকাসহ নানারকম মুখরোচক খাবার।

দেশের সর্ববৃহৎ ওয়াটার পার্ক সী-ওয়ার্ল্ড ফয়স লেক কমপ্লেক্সে পরিদর্শন করার সুযোগ হয়েছে আমরা কজনের। দলে ছিলাম আমি, সেলিনা আকতার সোহাগ, শাহনাজ আকতার, মুমু, মুনমুন প্রবেশ করি। লেক আর প্রকৃতির সৌন্দর্যে আমরা মুগ্ধ। পাহাড়ের সবুজ ঢেউয়ে হারিয়ে যায় প্রাণ। লেকের স্বচ্ছ জলে গঁড়িগঁড়ি বৃষ্টির আদর মেখে নিই চোখের ক্যামেরায়। বিজ্ঞানের আবদানে তৈরি আমাদের হাতে থাকা ডিজিটাল ক্যামেরাও সক্রিয় হয়ে ওঠে। আমরা ক্যামেরায় বন্দি করি ফয়েস লেকের নান্দনিক সৌন্দর্য। কিছুক্ষণ পরেই স্বচ্ছ জলরাশি পেরিয়ে সী-ওয়ার্ল্ডে যাওয়ার জন্য নৌকায় উঠি। বোট ছাড়ার পরপরই শরতের স্বচ্ছ আকাশে দেখি একটি চিল উড়ছে তো উড়ছেই। ফয়স লেকের সবুজ পাহাড় পা ডুবিয়ে দাঁড়িয়ে আমাদের অভ্যর্থনা জানাচ্ছে। আহা কি মনোহর দৃশ্য, এই প্রকৃতির! আমরা সবাই যেন ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছি তার রূপের বৈভবে। স্রষ্টার এই অপরূপ সৃষ্টির মধ্যে ব্যথিত প্রাণে সান্ত¡নার জারিত রস বহমান। এখন আমরা পৌঁছে গেছি সী-ওয়ার্ল্ডে। তড়িঘড়ি দলবেঁধে নেমে পড়লাম সুইমিংপুলে। হৃদয়ে আনন্দের জোয়ার তখন। জলের সাথে নর-নারীর এই সখ্যতার রহস্য কি জানি না। দেখি সবাই যেন জলকেলিতে জল হয়ে যেতে চাইছে। আমার হৃদয়ে অনুভব করলাম ছলছল জলের আওয়াজ। তার সাথে মিউজিকের সুর যেন সোনায় সোহাগা। এখানে প্রকৃতিপ্রেমীর হৃদয় প্রশান্তির অনির্বাণ ফোয়ারা। তার সান্নিধ্য পেয়ে পুলকিত হলো আমাদের হৃদয়। কিন্তু কতক্ষণ থাকা যায় এখানে? ফিরে যেতেই হবে যান্ত্রিক জীবনের সান্নিধ্যে। ফিরে যেতে ইচ্ছে নেই তবুও ফিরে আসতে হলো সবুজ পাহাড়ের আড়ালে সূর্যকে ডুবিয়ে দিয়ে আপন আলয়ে।

Please follow and like us:
0

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

CAPTCHA


error: Content is protected !!