পেরিয়ার লেক-কেরালা

কলকাতা থেকে সন্ধের ফ্লাইটে নেমেছি কোচি। ভেম্বানাদ লেকের দুই পাড়ে   কোচি ও এর্নাকুলাম দুটি যমজ শহর । কলকাতা  থেকে এর্নাকুলাম পর্যন্ত  ট্রেন লাইনও আছে। কিন্তু এক্সপ্রেস ট্রেনেও তিনদিন লেগে যায়, তাই ধরেছি ফ্লাইট।

কোচিতে কয়েকটা রাত কাটিয়ে আমাদের গন্তব্য পেরিয়ার লেক। একমাত্র গাড়ি নিয়ে যেতে হবে পাহাড় ও জঙ্গলের মধ্য দিয়ে । ভারতের কেরালা রাজ্যের ইদুক্কি জেলার মধ্যে পড়ে থেক্কাডি। সেখানেই আছে পেরিয়ার ন্যাশনাল পার্ক নামে একটি সংরক্ষিত বনাঞ্চল। পেরিয়ার নদীতে বাঁধ দেওয়ার ফলে বিশাল জায়গা জুড়ে জলাশয়ের সৃষ্টি হয়েছে, এর পুরোটাই সংরক্ষিত অরণ্যের মধ্যে পড়ে। পেরিয়ার লেকের জলে লঞ্চে এক পাক দেওয়াটাই এখানে বেশ মজাদার। যেহেতু চারপাশে ঘন বন, তাই ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলে  লঞ্চে বসে বুনো  হাতির পালের সঙ্গে মোলাকাত হতে পারে।

কেরালা ট্যুরিজমের তিনটি রিসর্ট আছে এই অরণ্যের মধ্যে। সবচেয়ে দামী লেক প্যালেস আছে একটা দ্বীপের মধ্যে। তার ভাড়া খাওয়াদাওয়া-সমেত ২০ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা দিনপ্রতি।

আমার আর ওই দ্বীপের মধ্যে থেকে কাজ নেই ! আমি কেরালা ট্যুরিজমের  সাইট থেকে অনলাইনে বুকিং করলাম “অরণ্যনিবাস” রিসর্টের একটি রুম, দু-দিনের জন্য। আমাকে দু’জনের ব্রেকফাস্ট ও ডিনার সহ দিতে হলো দিনপ্রতি ৪৬৩৩ টাকা ।

অরণ্যনিবাস রিসর্টে যাওয়ার জন্য বনে ঢুকতে হয়, আর বনের গেটে বনবিভাগের লোকেরা প্রবেশমূল্য আদায় করে। ভারি অদ্ভুত। আমরা দু’জন ও গাড়ির জন্য সব মিলিয়ে ১৪০ টাকা দিতে হলো। এই টিকিট মাত্র একদিনের জন্য প্রযোজ্য। যদি পরদিন গেট দিয়ে বাইরে বেরুই, তাহলে আবার রিসর্টে ফেরার সময় বনবিভাগকে টাকা দিতে হবে !

আমাদের রিসর্ট একেবারে জলের ধারে, যেখান থেকে বোটিং-এর জন্য লঞ্চ ছাড়ে। কিছু লঞ্চ আছে বনবিভাগের, আর কিছু পর্যটন দপ্তরের। আর যারা বহিরাগত টুরিস্ট তারা দীর্ঘক্ষণ লাইন দিয়ে নাজেহাল হয়ে টিকিট কেটে লঞ্চে ওঠে। সেটা বনবিভাগের লঞ্চ।

আর যারা ট্যুরিজম ডিপার্টমেন্টের রিসর্টে থাকে, তাদের কোনও ঝামেলা নেই। আমরা রিসেপশানে বলতেই ট্যুরিজমের লঞ্চের টিকিট পেয়ে গেলাম। সেই লঞ্চে ভিড় নেই, ধাক্কাধাক্কি নেই।

সংরক্ষিত অরণ্যের বাইরে থেক্কাডি শহরে প্রচুর হোটেল আছে। নানারকম দাম । কিন্তু অরণ্যের মধ্যে থাকার স্বাদই আলাদা। সন্ধে পাঁচটার পরে ভেতরে প্রবেশ বন্ধ হয়ে যায়।  তারপর অরণ্যের ঝিঁঝিঁর শব্দ, হনুমানকূলের সশব্দ লাফালাফি, আর বন্য গাছের ভেতর থেকে উঠে আসা সোঁদা গন্ধ।

সকালে ৬ টা থেকে নৌবিহার শুরু হয় । অত সকালে ঘুম ভাঙবে না বলে সকাল ৮টার স্লটের টিকিট নিয়েছিলাম।  আমরা তাড়াতাড়ি লঞ্চের দোতলায় উঠে সুবিধেজনক সিট দখল করে বসে পড়লাম। ভারতের নানা জায়গার লোক আছে লঞ্চে, কয়েকজন বিদেশী-বিদেশিনীকেও পেলাম লঞ্চে। খুব ধীর গতিতে লঞ্চ চলতে শুরু করল নিস্তব্ধ জলের উপর দিয়ে।  জলের মধ্যে অনেক গাছের শুষ্ক কাণ্ড উঁচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। প্রশান্ত সুনীল জলতল । কাকচক্ষু জল একেই বলে বোধ হয়। পানকৌড়ি ও ধনেশপাখিরা ওড়াউড়ি করছে জলের উপরে। ওরা বাসা বানিয়েছে ওই মরা গাছের মাথায়। ধনেশ পাখির বিশাল মো্টা ও লম্বা ঠোঁট, আর রঙচঙে ডানা। ক্যামেরা তাক করতে না করতেই উড়ে উড়ে সরে যাচ্ছে দূরে। তাই চলন্ত লঞ্চ থেকে  ভালো ছবি পেলাম না।

লঞ্চ থেকে দেখলাম, দূরে কয়েকটি বুনো হাতি ঘুরছে। এত দূরে যে ছবি তোলা সম্ভব হলো না। একটা বুনো শুকরকেও দেখলাম। শুনলাম বাঘও আছে নাকি এই বনে। আমার ভাগ্য ততো সুপ্রসন্ন ছিলো না, তাই প্রাণী-দর্শন তেমন সুখকর হলো না।

পেরিয়ার লেকে মাত্র দেড় ঘন্টা ঘুরিয়ে আবার রিসর্টের সামনে এনে নামিয়ে দিলো আমাদেরকে।

 

Please follow and like us:
0

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

CAPTCHA


error: Content is protected !!