ত্রিপুরায় রুদ্রসাগরের বুকে অপরূপ নীরমহল

ত্রিপুরা রাজ্যের সিপাহিজলা জেলার মেলাঘর গ্রামে রাজাদের আনাগোনা ছিল। সেখানে থাকা জলাশয় রুদ্রসাগর ঘিরেই রাজাদের এই আগ্রহ। যে কারণে সেখানে নির্মিত হয় জলমহল। ত্রিপুরা রাজ্যের স্থাপত্যের অপূর্ব নির্দশন এই জলমহল। রাজস্থানের জলমহলের আদলে তৈরি এটি দেশি-বিদেশী পর্যটকদের আকর্ষনীয় পর্যটন কেন্দ্র। প্রায় ৫.৩ কিলোমিটার বিস্তৃত এই প্রাকৃতিক জলাশয়ের নাম রুদ্রসাগর। যার বুকে ভেসে আছে এই অপূর্ব র্কীতি। রাজাদের গ্রীষ্মকালীন অবকাশ কাটানোর জন্যই জলমহালটি তৈরি হয়েছিল।

১৯৩০ সালে ত্রিপুরার শেষ মহারাজা বীরবিক্রম কিশোর মানিক্য নীরমহল নির্মাণ শুরু করেন। ১৯৩৮ সালে অপরুপ শিল্পসুষমামন্ডিত এই স্থাপত্যটির নির্মাণ কাজ শেষ হয় এবং ১৯৩৮ সালের ১২ মে এটি  উদ্বোধন হয়। এই কাজটি সম্পন্ন করেন মার্টিন এন্ড বার্ণ কোম্পানী। এটি নির্মাণে খরচ হয় আনুমানিক ১০ লক্ষ টাকা। এই প্রাসাদের একদিকে যেমন রয়েছে বীরবিক্রমের সঙ্গীত, সাহিত্য ও শিল্পীমনের পরিচয়, অন্যদিকে রয়েছে হিন্দু ও মুঘল স্থাপত্যের  সংমিশ্রন।

নীরমহল ভারতের দ্বিতীয় এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের একমাত্র জলমহল। এই মহলটিতে রয়েছে ২৪টি কক্ষ। এরমধ্যে রাজদরবার, নাচমহল, অন্দরমহল, অতিথিশালা, রাজা-রানীর থাকার জায়গা, ওয়াচ টাওয়ার, সেনা ব্যারাক, জেনারেটর ঘর, রান্নাঘর, ফুলের বাগান, শৌচালয়ের সন্নিবেশেই এই মহল। মহলটি ১৯৬৮ সালে রাজপরিবার কর্তৃক ত্রিপুরা সরকারের রাজস্ব দপ্তরের অধীনে হস্তান্তরিত হয় এবং রাজস্ব দপ্তর কর্তৃক ১৯৭৮ সাল থেকে তথ্য সংস্কৃতি এবং পর্যটন দপ্তর দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। পর্যটকদের থাকার জন্য ত্রিপুরা পর্যটন উন্নয়ন নিগম রুদিজলার পাশেই নির্মাণ করেছেন পর্যটক আবাস ‘সাগরমহল’।

অনিন্দ্যসুন্দর এই স্থাপনাটি যেকারো দৃষ্টি কাড়বে। তৎসময়ে রাজাদের আমোদ ফূর্তির স্মৃতিতে রোমান্থন হবে যে কোন প্রেমিক জুটি। আসলেই কত প্রেম-ভালোবাসা, সাহিত্য, কৃষ্টি, সংস্কৃতিতে মশগুল ছিল সেসময়ের রাজারা। নীরমহলই তার প্রমাণ। নিস্তব্ধ, নীরবতায় সময় কাটাতে নীরমহলের জুড়ি নেই। রাতের নীরমহল আলো ছড়ায়। রাতের নীরমহলের শোভা আরো বিমোহিত করে।

নীরমহলে যা আছে :  ত্রিপুরার রাজাবাহাদুর এবং রানী সাহেবা দুজনেই ছিলেন অত্যন্ত রবীন্দ্র অনুরাগী। গান, বাজনা নাটক চলতেই থাকত তাই সেখানে নির্মিত হয়েছিল একটি নাট্যমঞ্চ। সেখানে রান্নাঘর-রন্ধনশালা এবং ভোজনকক্ষ ছিল পাশাপাশি। নাচগান দেখার পর রাজার পরিবারবর্গ, আত্মীয়স্বজন এবং ঘনিষ্ঠ বন্ধু-বান্ধবের জন্য থাকত বিশাল খাবার আয়োজন। সেই ভোজনকক্ষে বসেই সবাই খাবার খেতেন। রাজা ঘনিষ্ট পরিজনদের নিয়ে আমোদ-প্রমোদে ব্যস্ত থাকতেন বলেই সেখানে বানিয়েছিল প্রমোদগৃহ। সেখানে অন্যদের প্রবেশ নিষেধ ছিল। নাচঘরের পাশেই ছিল রাজার শয়ন কক্ষ। রাজা যখন পরিশ্রান্ত বোধ করতেন তখন মনোরম সাজেসজ্জিত ঐ শয়ন কক্ষে গিয়ে বিশ্রাম করতেন। রাজার ঘনিষ্টদের থাকার জন্য অতিরিক্ত একটি ঘরের ব্যবস্থা ছিল। প্রয়োজনমতো তাদের জন্য পরিপাটি ব্যবস্থা হতো রাজার নির্দেশে। এক্ষেত্রে কোনরকম ক্রুটি তিনি পছন্দ করতেন না। তাই রাজার নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করা হতো। নীরমহলে গোলাকৃতির ঘরটি ছিল নাচঘর। তার চারদিকে চারটি ঘর। তার সৌন্দর্য্য এখনো সবাইকে অভিভূত করে। সেখানে বিশেষ প্রয়োজনে রাজার মন ভরিয়ে দেবার জন্য মাঝে মধ্যেই জলসা বসতো। রাজার দর্শনপ্রাপ্তির জন্যে যারা আসতেন তাদের জন্য একটি সাজানো ঘর আছে। এই দর্শন গৃহটি সর্বদা থাকতো উন্মুক্ত। রাজামশাই কাউকেই বিমুখ করতেন না। সেখানেই সবার সঙ্গে সাক্ষাত করতেন রাজা।

প্রবেশ ফি:  নীরমহল পরিচালনায় কর্তৃপক্ষের ভূমিকায় আছে রুদ্রসাগর উদ্বাস্তু ফিসারম্যান সমবায় সমিতি লিমিটেড। তাঁরাই মূলত নৌকায় করে পর্যটকদের নীরমহলে নিয়ে যায়। নৌকায় করে নীরমহল পরিদর্শনে যেতে দশটি শর্ত মেনে চলতে হয়। শর্তগুলো হলো- নীরমহল দেখার মোট সময় ৪০ মিনিট। অতিরিক্ত সময়ের জন্য প্রতি ঘন্টায় প্রতিজনকে ১৫০ টাকা দিতে হবে। লোক সংখ্যা গণণা করে নৌকার টিকিট সংগ্রহ করতে হয়। নৌকায় খাদ্যদ্রব্য, মাইক বহন নিষিদ্ধ। নৌকায় দাঁড়ানো, পানিতে হাত দেয়া, মাদক দ্রব্য সেবন নিষেধ। মহিলা, শিশু ও বয়স্কদের অগ্রাধিকার দেয়া হয় নৌকায়। নীরমহলে মূল স্থাপনায় প্রবেশে পূর্ণবয়স্কদের ক্ষেত্রে দশ টাকা ও বার বছরের কমবয়সী শিশুদের জন্য পাঁচ টাকার টিকিট লাগে। এছাড়াও ক্যামেরা ব্যবহারেও বাড়তি চার্জ গুনতে হয়।

নিজের অনুভূতি :  ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলার নামকরা স্যন্দন পত্রিকার এক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে চট্টগ্রাম জার্নালিস্ট স্পোর্টস ক্লাবের সাথে সফরসঙ্গী হই আমিও। আগরতলার উমাকান্ত মিনি স্টেডিয়ামে প্রীতি ক্রিকেট ম্যাচের আয়োজন ছিল। সুন্দর ও বাঙালিয়ানায় ভরা শহর আগরতলা থেকেই সব আনুষ্ঠানিকতা সেরে আমরা সিপাহিজলার নীরমহলের উদ্দেশ্যে  রওনা হই। আগরতলার মূল শহর থেকে দেড় ঘন্টা জার্নিতেই নীরমহল পৌঁছা যায়। দুই পাশের রাবার বাগানের ফাঁক গলে বিস্তীর্ণ সড়ক। সুন্দর ও মনোরম সড়কটিতে গাড়ির চাপ কম। যে কারণে  দ্রুত গতিতেই ছুটে চলেছিল আমাদের বহনকারী গাড়ি। মুখে ‘গুল ‘ চিবিয়ে চালকও ব্যাপক তাড়াহুড়ায় পৌঁছিয়ে দিলেন নীরমহলে। গাড়ি থেকে নেমেই বিশালাকার জলমহালে ভাসতে থাকা নীরমহল চোখ জুড়িয়ে যায়। বাঁশ-কাঠে বাঁধানো রুদ্রসাগরের ঘাট। যেখানে নোঙর করে রাখা কয়েকটি নৌকা। সরস্বতী পূঁজার কারণে সেখানে ছিল বন্ধের দিন। যে কারণে মানুষের আনাগোনাও ছিল কম। তাইতো আরাম আয়েশেই নীরমহলে কাটিয়ে দিলাম দিনের অর্ধেক সময়। বাকি সময়ে রাজবাড়ি দেখার প্রয়াসে আগরতলায় ফিরে আসলেও বন্ধের কারণে সেটি আর দেখা হয়নি। আগামীতে আগরতলা যাবো আরেকবার। রাজবাড়ি দেখার অপূর্ণতা সেবার হয়তো পূরণ করবো। প্রার্থনা শুধু, জীবনের গতিটা যেন সচল থাকে।

Please follow and like us:
0

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

CAPTCHA


error: Content is protected !!