ডেড সি : ইচ্ছা করলেও ডোবা যায় না যে সাগরে

ডেড সী বা মৃত সাগর যে নামেই ডাকি না কেন বিশ্বের আর দশটা সমুদ্রের চেয়ে এই সমুদ্রটি একটু আলাদাভাবে পরিচিত। কারণ এর বিচিত্র বৈশিষ্ট্য। পৃথিবীর অন্যান্য সমুদ্রের মতো এই সমুদ্রের পানিও লবণাক্ত। তারপরও এটি অন্যগুলোর চেয়ে আলাদা কেনো? ধরুন আপনি পুকুর, নদী বা সমুদ্রের পানিতে নেমেছেন। আপনি যদি সাঁতার না কাটেন তাহলে স্বাভাবিকভাবেই পানির নিচে তলিয়ে যাবেন। কিন্তু এই ডেড সীতে আপনি হাত-পা না নাড়িয়েই ভেসে থাকতে পারবেন। আপনি ডোবার জন্য হাজার চেষ্টা করলেও ডুবতে পারবেন না।

অবস্থান ও আয়তন : এটি জর্ডানে অবস্থিত। ডেড সি’র পশ্চিমে পশ্চিম তীর এবং ইসরায়েল, পূর্বে জর্ডান অবস্থিত। জর্ডানের রাজধানী আম্মান থেকে ১৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ডেড সি। সাগরের সিংহভাগ ইজরায়েলে। এই হ্রদটি এত বিশাল যে এটা উত্তর দক্ষিণে ১০৬ কি.মি. লম্বা আর পূর্ব পশ্চিমে ১৫ কি.মি. এর মতো। অধিকাংশ স্থানে এর গভীরতা প্রায় ১৭০০ ফুটের মতো।

মানুষ ভাসে কেন ? এর অবস্থান আরবের শুষ্ক অঞ্চলে হওয়ার ফলে হ্রদ থেকে বাষ্পীভবন অর্থাৎ পানি থেকে বাষ্প হওয়ার প্রবণতা অনেক বেশি। আর সেখানে বৃষ্টিপাতও নামমাত্র হয়। তাই প্রতিদিনই নদীবাহিত লবণ জমে ডেড-সি এর পানিতে লবণের অনুপাত বেড়ে যাচ্ছে। বাড়তে বাড়তে এখন এমন জায়গায় দাঁড়িয়েছে যে এর পানির আপেক্ষিক গুরুত্ব মানুষের পুরো শরীরের আপেক্ষিক গুরুত্বের চেয়েও বেশী। ফলে কোনো মানুষই এর পানিতে ঝাঁপ দিলে এখন আর ডোবেনা, ভেসেই থাকে।

মৃত সাগর বলার কারণ : নামে সমুদ্র হলেও আসলে ডেড-সি একটি হ্রদ। আগে কোনোদিন এটি সাগরের সঙ্গে যুক্ত ছিল, আকাবা উপসাগরের মাধ্যমে। এখন কিন্তু এটি অবরুদ্ধ হ্রদ ছাড়া আর কিছু নয়। এই হ্রদে পানি আসে নদী দিয়ে। এখানকার পানির লবণাক্ততা সাগরের জলের তুলনায় ৮.৬ গুণ বেশি! এই বিশাল হ্রদে তাই কোনো গাছপালা ও মাছ নেই। কারণ এত ঘন জলে কিছুই বাঁচতে পারে না। আর তাই এই হ্রদকে বলা হয় ডেড সি বা মৃত সাগর। তবে মাছ নেই বলে যে হ্রদে কোনো জীবন্ত প্রাণীই নেই, তা কিন্তু নয়! এই হ্রদে আছে নানা রকমের ব্যাকটেরিয়া আর ছত্রাক। আর কিছু নেই। এই হ্রদটি কিন্তু মোটেও বিষাক্ত নয়। আসলে এখানে কোনো প্রাণী নেই এর জলের লবণাক্ততার জন্য।

প্রচলিত কল্পকথা : এই সাগরটির সবচেয়ে প্রচলিত নাম ডেড সি বা মৃত সাগর হলেও এর আরও কয়েকটি নাম নাছে। যেমন, সি অফ সোডোম, সি অফ লট, সি অফ এ্যাসফ্যাল্ট, স্টিংকিং সি, ডেভিলস্ সি। ডেড সি’র অন্য নামগুলো কেমন অদ্ভূত।আসলে এই সাগরে কোনো প্রাণী বা উদ্ভিদ বাঁচতে পারে না, তাই অনেক আগে, তখনো তো বিজ্ঞানের এতো উন্নতি হয়নি, এই সাগরকে ঘিরে মানুষ নানা কাল্পনিক কাহিনী তৈরি করেছিলো। অনেকে মনে করতো, এই সাগরে শয়তান আছে, নয়তো শয়তানের অভিশাপ আছে, তা নইলে পানি আছে, মাছ নেই, এ কেমন করে হয়? আর তাই তারা এর নাম দিয়েছিলো ডেভিলস সি। আবার এই সাগরের তীরেই ছিলো সোডোম নামের একটি শহর। সেখান থেকেই এর নাম দেয়া হলো সি অফ সোডোম।

নেই কোনো পাখির চিহ্ন: ডেড সি-তে ঘুরতে গেলে সেখানে কোনো পাখি না দেখলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কারণ এই হ্রদের উপর দিয়ে কোন পাখি যাওয়া আসা করে না। এই হ্রদের জঘন্য লোনা পানিতে মাছের বংশ তো দূরের কথা একটা পোকামাকড়ও জন্মাতে পারে না। আর তাই মাছ, পোকামাকড় না থাকলে কি পাখিরা আসতে পারে?

পেছনে ফিরে দেখা যাক : তা প্রায় তিন মিলিয়ন বছর আগের কথা। সে সময় বর্তমান জর্ডান নদী, মৃত সাগর ও ওয়াদি আরাবাহ অঞ্চল লোহিত সাগরের পানিতে বারবার প্লাবিত হতো। এর ফলে একটি সরু উপসাগরের সৃষ্টি হয়। উপসাগরটি জেজরিল উপত্যকায় একটি সরু সংযোগের মাধ্যমে লোহিত সাগরের সাথে যুক্ত ছিল। প্রাকৃতিক তত্ত্ব অনুযায়ী প্রায় ২ মিলিয়ন বছর পূর্বে উপত্যকা এবং ভূমধ্যসাগরের মধ্যবর্তী স্থলভাগ যথেষ্ট উচ্চতা লাভ করে। ফলে মহাসাগরের প্লাবনে এই অঞ্চলে সৃষ্ট উপসাগরটি পরিবেষ্টিত হয়ে হ্রদে পরিণত হয়।

বহু রোগের চিকিৎসক : নামে মৃত সাগর হলেও কিন্তু এই সাগর অঞ্চলটি জীবন ধারণের জন্য খুবই উপযোগী। সাগরের আশপাশে তেমন গাছ নেই, সাগরের নিচে তো কিছুই নেই, তাই বাতাসে গাছের পরাগরেণুও নেই। নেই অ্যালার্জি হতে পারে এমন কোনো উপাদান। আবার ত্বকের জন্য ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি এ অঞ্চলে আসে খুবই কম। সব রোগশোকে ভুগতে থাকা রোগীদের বায়ু পরিবর্তনের এক আদর্শ জায়গা এই মৃত সাগর। বিশেষ করে নানা জটিল চর্মরোগে আক্রান্ত রোগীদের থাকার জন্য এর চেয়ে ভালো জায়গা আর হয় না। আবার শ্বাসকষ্টের রোগীদের জন্য তো এই এলাকাই একটা চিকিৎসা। এখানকার আবহাওয়া শ্বাসকষ্টের রোগীদের জন্য খুবই উপকারী। শুধু তাই নয়। এই মৃত সাগরটির কাদা অনেক রোগ নিরাময়ে সহায়ক। তাই দিনে দিনে এটি হয়ে উঠেছে চিকিৎসা শাস্ত্রের গবেষণা কেন্দ্র। কারণ হ্রদের পানিতে খনিজ দ্রব্যাদির উপস্থিতি, বাতাসে এলার্জি উৎপাদক দ্রব্য এবং পরাগরেণুর স্বল্পতা, উচ্চ ভূ-ম-লীয় চাপ, সৌর বিকিরণে অতিবেগুনি উপাদানের কম উপস্থিতি। উচ্চ বায়ুম-লীয় চাপ, শ্বাসকষ্টে ভুগতে থাকা রোগীদের জন্য বেশ উপকারী। চর্মরোগ সোরিয়াসিস এর জন্য দীর্ঘসময় সূর্যস্নান বেশ উপকারী।

পর্যটন কেন্দ্র : সারাবিশ্বের পর্যটকদের কাছে এটি একটি অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। প্রতি বছর প্রায় ২ লাখ পর্যটক মৃত সাগরে বেড়াতে আসেন। তেমন কোনো প্রাণের স্পন্দন না থাকলেও ঘুরে বেড়ানোর জন্য এটি একটি উপযুক্ত স্থান। কারণ হতে পারে, অদ্ভুত এই সাগরটিকে একবার নিজের চোখে দেখা, অদ্ভুতুড়ে কিছু গাছ রয়েছে এই এলাকাটিতে যা পৃথিবীর অন্য কোথাও নেই, আর পৃথিবীর সবচেয়ে নিচু স্থল আর জলভাগ দেখার মজা তো আছেই। তার ওপর পৃথিবীর সবচেয়ে নিচু হাইওয়েথ ‘হাইওয়ে ৯০’। কত নিচু? সমুদ্র সমতল থেকে এই হাইওয়ে ৩৯৩ মিটার নিচু। মানে পৃথিবীর অন্য কোনো সাগরের আশপাশে হলে এই হাইওয়ে থাকত সাগরের পানির ৩৯৩ মিটার নিচে। ডেড সিতে বৃষ্টিপাতের পরিমাণও খুবই কম। এখানে বছরে প্রায় ৫০ মিলিমিটারেরও কম বৃষ্টিপাত হয়।

সকল ধর্মেই উল্লেখ রয়েছে এই সাগরটির। বিভিন্ন ধর্ম ও ধর্মগ্রন্থে এই স্থানটির কথা বর্ণনা করা হয়েছে। ডেড সি বা মৃত সাগর যে স্বাভাবিক কারণে সৃষ্টি হয় নি সেটা এই ইতিহাসগুলো দ্বারা সহজেই অনুধাবন করা যায়।

ইসলাম ধর্মে: ডেড সি বা মৃত সাগরের কথা ইসলাম ধর্মে বেশী বলা হয়েছে। এই স্থানটি এরূপ হওয়ার কারণ হিসেবে আল কুরআনের তথ্য গুলো সবচেয়ে বেশী সত্য, সঠিক ও বিশ্বাসযোগ্য। ইসলাম ধর্মে এ অঞ্চলকে হযরত লূত (আঃ) এর অনুসারীদের আবাসস্থল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। লূত (আঃ) এর উম্মতগণ এই এলাকায় বসবাস করতো। তখন এই স্থানটি ছিল স্বাভাবিক এবং মানুষ বসবাসের জন্য খুবই উপযোগী। তৎকালীন সময়ে লূত (আঃ) এর অনুসারীরা চরম পাপে লিপ্ত হয়েছিল। তারা সমকামিতার মতো নির্লজ্জ পাপে ছিল। সমকামের পাপাচারের কারণে এই জাতিকে মহান আল্লাহতায়ালা ধ্বংস করে দিয়েছিলেন। লূত (আঃ) তার অনুসারীদের বারবার পাপ কাজ হতে বিরত থাকার আদেশ প্রদান করে ব্যর্থ হলে এই জাতির পাপের প্রতিদান স্বরূপ আল্লাহ তার ফেরেশতাদের প্রেরণ করেন তাদের কঠিন শাস্তি প্রদান করার জন্য। আল্লাহর আদেশে ফেরেশতারা এসে এই জাতিকে ধ্বংস করার জন্য এই স্থানের ভূমিকে উল্টে দেন, ফলে পাপিষ্ঠ জাতিটি মাটি চাপা পড়ে ধ্বংস হয়ে যায়। মাটি উল্টে দেওয়ার কারণে এখানের ভূমি নিচে নিমে যায়। বর্তমান বিজ্ঞানীরা অনুসন্ধান করে প্রমাণ পেয়েছেন যে, বর্তমানে এই স্থানটি পৃথিবীর সবচেয়ে নিচু স্থান। মহাগ্রন্থ আল-কুরআনের সূরা রুম এ লূত (আঃ) এর জাতির কলঙ্কিত ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

খ্রিস্ট ধর্মে : ডেড সি বা মৃত সাগরের দুর্গম এ অঞ্চল বাইজেন্টাইন শাসকদের আমল থেকে গ্রিক অর্থোডক্স সন্ন্যাসীদের আকৃষ্ট করতে শুরু করেছিল। ওয়াদি কেল্টে অবস্থিত সেইন্ট জর্জ গির্জা এবং জুদাই মরুভূমিতে মারসাবা মন্দির খ্রিস্টানদের তীর্থস্থান। এই সকল স্থানে খ্রিস্টানদের যাতায়াত ছিল বহু বছর ধরে।

ইহুদী ধর্মে : মৃত সাগরের উত্তর তীরবর্তী জেরিকো শহরের নামটি ইহুদী ধর্মগ্রন্থগুলোতে উল্লেখ করা হয়েছে। বুক অব জেনেসিস এ উল্লেখিত নবী আব্রাহামের সময়কালে ধ্বংসপ্রাপ্ত সোডম এবং গোমোরা শহর এবং তিনটি সমতল ভূমির শহর আদমাহ, জেবোইম এবং জোয়ার শহরের অবস্থান সম্ভবত মৃত সাগরের দক্ষিণপূর্ব উপকূলে বলে ধারনা করা হয়।

মৃত সাগর সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী : পবিত্র বাইবেলে মৃত সাগরের লবণাক্ততা বিলুপ্ত হওয়া সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে। এজেকেইল এ সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে মৃত সাগরের পানি স্বাদু হয়ে যাবে, এমনকি মাছের বসবাসের উপযোগী হয়ে উঠব। জেকরিয়াহতে উল্লেখ আছে জেরুজালেমের পানি দুভাগে ভাগ হয়ে যাবে, একভাগ জমা হবে পূর্ব সাগর বা মৃত সাগরে এবং অন্য ভাগ জমা হবে পশ্চিম সাগর বা ভূমধ্যসাগরে।

হারিয়ে যেতে বসেছে : পানি স্বল্পতার কারণে ডেড সি বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার আশংকা দেখা দিয়েছে। আশপাশের খরাপ্রবণ দেশগুলিতে সেচের পানির যোগান দিতে দিতে ফুরিয়ে যাচ্ছে হ্রদের উৎস নদীগুলিও। লবণ হ্রদ থেকে খনিজ লবণ সংগ্রহ করছে বিভিন্ন বাণিজ্যিক সংস্থা। তারও বিরূপ প্রভাব পড়ছে ডেড সি-তে। মানুষের সঙ্গে ধ্বংসের খেলায় হাত মিলিয়েছে প্রকৃতি। পৃথিবীর উষ্ণায়নও ডেড সির মৃত্যুর অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে আশঙ্কা গবেষকদের। বিশেষজ্ঞদের মতে, পানি সরবরাহ না করলে ডেড সি ২০৫০ সালের মধ্যে পানিশূন্য হয়ে পড়বে।

এদিকে ডেড সি রক্ষায় নতুন একটি চুক্তি সই করতে যাচ্ছে ইসরায়েল, জর্দান ও ফিলিস্তিন। ইসরায়েলের জ্বালানি ও আঞ্চলিক উন্নয়নবিষয়ক মন্ত্রী সিলভান শালম জানান, চুক্তি অনুযায়ী ডেড সির উত্তরাঞ্চলীয় প্রান্তের গলফ অব আকাবা থেকে পানি উত্তোলন করা হবে। এর কিছু অংশের লবণাক্ততা দূর করে ইসরায়েল, জর্দান ও ফিলিস্তিনে দেওয়া হবে। আর বাকি পানি চারটি নল দিয়ে সরবরাহ করা হবে ডেড সিতে।

Please follow and like us:
0

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

CAPTCHA


error: Content is protected !!