ঝর্ণার রাণী খৈয়াছড়া

মিরসরাই উপজেলার ১২ নম্বর খৈয়াছড়া ইউনিয়নের বড়তাকিয়া বাজারের উত্তর পার্শ্বে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ৪.২ কিলোমিটার পূর্বে খৈয়াছড়া ঝর্ণার অবস্থান। এরমধ্যে ১ কিলোমিটার পথ গাড়িতে যাওয়ার পর বাকী পথ যেতে হয় পায়ে হেঁটে। মিরসরাইয়ের এই ৯ স্টেপ’র ঝর্ণা বিস্ময়কর। খৈয়াছড়া আকার আকৃতি ও গঠণশৈলীর দিক দিয়ে নিঃসন্দেহে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ঝর্ণাগুলোর একটি। এর মোট ৯ টি মূল ধাপ এবং অনেকগুলো বিচ্ছিন্ন ধাপ প্রমাণ করে যে এমন আর একটা ঝর্ণাও বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত দেখা যায়নি।

খৈয়াছড়ার প্রথম ধাপটি অসাধারণ। বেশ উঁচু থেকে পাহাড়ের নিস্তব্ধতাকে ছাপিয়ে নিচে আছড়ে পড়ছে সুশীতল জল। এর পাশ দিয়েই খাড়া পাহাড় বেয়ে উঠতে হবে বাকি নয়টি ধাপ। খাড়া পাহাড়ের গা বেয়ে ওঠার পরে সামান্য কিছু নিচে নেমে এর দ্বিতীয় ধাপ। যেটা প্রথম ধাপ থেকে একেবারেই আলাদা। সরু জায়গা থেকে প্রবাহিত ঝর্ণাধারা একটু নিচে এসেই প্রসারিত হয়ে গেছে এখানে। দ্বিতীয় ধাপ থেকে তৃতীয় ধাপটি আরো বেশি স্বতন্ত্র। এ জায়গা থেকে ভালোভাবে তিনটি ধাপের প্রবাহ দেখা যায়। অনেকটা বড়সড় পুকুরের মতো জলাধার আছে এটি গোসল করার জন্যও বেশ ভালো জায়গা। এখান থেকে একেবারে ঝর্ণার পাশ দিয়ে খাড়া পাহাড় বেয়ে উঠতে হবে চতুর্থ ধাপে। তবে এধাপ থেকে পঞ্চম, ষষ্ঠ ও সপ্তম ধাপের উচ্চতা তুলনামূলক কম। ওঠাও বেশ সহজ। খৈয়াছড়া ঝর্ণার অষ্টম ধাপটি আবার একটু উঁচুতে হলেও বেশ প্রসারিত। এখান থেকে কিছুটা খাড়া পাহাড় বেয়ে উপরে উঠলেই এর নবম ধাপ। এখানেও জলপ্রপাতটির ঠিক নিচে মাঝারি আকারের একটি গর্ত। এটিও গোসল করার জন্য ভালো। খৈয়াছড়ার সর্বশেষ এ ধাপটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় দুই হাজার ফুট ওপরে। এ জায়গা থেকে পাহাড় বেয়ে আরো কিছুটা উপরে ওঠা যায়। এখানে ওঠা খুবই কষ্টসাধ্য। তবে উঠতে পারলে ঝুলিতে ভরতে পারবেন বাড়তি একটি পাওনা। তা হলো পাহাড়ের চূড়া থেকে দূরের সমুদ্র দেখা।

খৈয়াছড়াতে সব সময় জ্বলে (এমন কি বৃষ্টিতেও) এমন একটি পাহাড় আছে, সেখানে আগুন কখনও নিভে না। প্রকৃতির নান্দনিক তুলিতে আঁকা সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হচ্ছে দেশের ভ্রমণপিয়াসী মানুষ। অনেকে রাতের বেলায় চাঁদের আলোয় ঝর্ণার অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে পাহাড়ের পাদদেশে তাবু খাটিয়ে অবস্থান করেন। প্রকৃতির অপরূপ সৃষ্টি খৈয়াছড়া, সবুজের চাদরে ঢাকা বনানী রূপের আগুন ঝরায়, যেখানে প্রকৃতি খেলা করে আপন মনে, ঝুম ঝুম শব্দে বয়ে চলা ঝর্ণাধারায় গা ভিজিয়ে মানুষ যান্ত্রিক জীবনের অবসাদ থেকে নিজেকে ধুয়ে সজীব করে তুলছে খৈয়াছড়া ঝর্ণায়। অনেকগুলো বিচ্ছিন্ন ধাপ, যা বাংলাদেশের আর কোন ঝর্ণাতে এখন পর্যন্ত দেখা যায়নি। তাই খৈয়াছড়াকে বলা হয় বাংলাদেশের ‘ঝর্ণা রাণী’।

প্রায় ৫০ বছর আগে থেকেই প্রবাহিত হচ্ছে খৈয়াছড়া র্ঝণাটি। এতদিন পাহাড়ি এলাকা এবং ঝোঁপঝাড়ের জন্য কেউ তা আবিষ্কার করতে পারেনি। তাছাড়া এদিকে মানুষের আগমন তেমন ছিলই না। ২০১০ সালে সরকার বারৈয়াঢালা ব্লক থেকে বড়তাকিয়া ব্লকের ২৯৩৩.৬১ হেক্টর পাহাড়কে জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা করায় খৈয়াছড়া র্ঝণা জাতীয় উদ্যানের আওতাভূক্ত হয়। ছুটির দিনগুলোতে পর্যটকরা সবুজের সমারোহ পাহাড় আর ঝর্ণা দেখতে এখানে ছুটে আসে। পাহাড়ের সবুজ রং আর ঝর্ণার স্বচ্ছ জল মিলেমিশে একাকার হয়েছে মিরসরাইয়ের প্রাকৃতিক জলপ্রপাত খৈয়াছড়া ঝর্ণায়। প্রকৃতির নান্দনিক তুলিতে আঁকা এ ছবি দেখে মুগ্ধ হচ্ছে দেশের ভ্রমণপিয়াসী মানুষ।

কিভাবে যাবেন : ঢাকার যেকোনো বাস কাউন্টার থেকে চট্টগ্রামগামী বাসে উঠবেন। যাওয়ার পথে ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়কের মিরসরাই পৌরবাজার পার হয়ে বড়তাকিয়া বাজারের আগে খৈয়াছড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে নামবেন। পথে যানজট না থাকলে ৪/৫ ঘণ্টার মধ্যেই পৌঁছে যাবেন মিরসরাই। ঢাকার ফকিরাপুল, সায়দাবাদ থেকে সোহাগ পরিবহন, গ্রীণ লাইন পরিবহণ, সৌদিয়া পরিবহন, হানিফ এন্টারপ্রাইজ, টি আর ট্রাভেলসের এসি বাস যায় চট্টগ্রাম। ভাড়া ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২শ’ টাকা। এছাড়া শ্যামলী, হানিফ, সৌদিয়া, ইউনিক, এস আলম ইত্যাদি পরিবহনের নন এসি বাসও চলে এ পথে। ভাড়া ৪৮০ টাকা।

বড়তাকিয়া বাজারে খৈয়াছড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে থেকে পূর্বদিকে গ্রামের রাস্তা ধরে দশ মিনিট হাঁটলে রেললাইন পড়বে, রেললাইন পার হয়ে আরো দশ মিনিট হাঁটলে একটি ঝিরি পাবেন। ইচ্ছে করলে ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়ক থেকে ঝিরি পর্যন্ত আপনি সিএনজি অটোরিকশা নিয়ে (৭০-৮০ টাকা) যেতে পারবেন। ওখান থেকে আপনাকে খৈয়াছড়া ঝর্ণার মূল ট্র্যাকিং শুরু করতে হবে। প্রয়োজন হলে সেখান থেকে গাইডও নিয়ে নিতে পারেন। ঝর্ণায় যাওয়ার রাস্তা একটিই। পথে আরো অনেক অ্যাডভেঞ্চারপিয়াসীর দেখা পাবেন, কাজেই পথ হারানোর ভয় নেই। জঙ্গলের ভেতর দিয়ে পাহাড়ি ঝিরিপথ ধরে প্রায় দেড় ঘণ্টা হাঁটলে দেখা পাবেন ঝর্ণার। হাতে সময় নিয়ে যাওয়া ভালো, ঝর্ণা দেখে ফিরতে ফিরতে বেশ সময় লাগবে। খাবার সঙ্গে করে নিয়ে যেতে পারেন, তবে ঝর্ণায় যাওয়ার পথেই অন্তত তিনটি জায়গায় দেখা মিলবে স্থানীয় হোটেলের, চাইলে সেখান থেকেও খেয়ে নিতে পারেন। খাবারের দাম তুলনামূলক সস্তা।

থাকার জায়গা : বড়তাকিয়া বাজারে থাকার কোন হোটেল নেই। কিন্তু আপনি চাইলে চেয়ারম্যানের বাংলোয় উঠতে পারেন। মিরসরাই বা সীতাকুন্ডে আপনি থাকার জন্য বেশকিছু স্থানীয় হোটেল পাবেন। মিরসরাই বা সীতাকুন্ডে খাওয়ার জন্য অনেক রেস্টুরেন্টও পাবেন। থাকার জন্য চট্টগ্রাম বা ফেনীর হোটেলই উত্তম।

মনে রাখবেন: চিপসের প্যাকেট, সিগারেটের ফিল্টার, পানির বোতলসহ অন্যান্য আবর্জনা যেখানে সেখানে ফেলবেন না। এই ঝর্ণা বাংলাদেশের মানুষের সম্পদ। অপচনশীল এসব আবর্জনা ফেলে এর পরিবেশ নষ্ট করা আপনার কোনোভাবেই উচিত হবে না। আবর্জনা ফেলার জন্য পথেই ডাস্টবিন পাবেন, না পেলে কষ্ট করে নিজের সঙ্গে রাখুন, বাইরে এসে কোথাও ফেলবেন। পথে জোঁক থাকতে পারে, সতর্ক থাকবেন। লবণ সঙ্গে রাখলে ভালো হয়। জোঁক কামড়ালে হাত দিয়ে টেনে ছাড়াতে যাবেন না, লবণ ছিটিয়ে দিলেই কাজ হবে। সিগারেটের তামাকও ব্যবহার করতে পারেন। ঝর্ণায় যাওয়ার রাস্তা বেশ দুর্গম। শিশু, বয়স্ক বা অপ্রাপ্তবয়স্কদের নিয়ে যাওয়া কোনোভাবেই উচিত হবে না, নিজেও যথেষ্ট সতর্ক থাকবেন। মারাত্মক কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে ওই দুর্গম রাস্তা পাড়ি দিয়ে ফিরে আসা প্রায় অসম্ভব। মোট নয় ধাপের এই ঝর্ণার পাশের খাড়া পাহাড় দিয়ে একদম ওপরে ওঠা যায়। তবে এই পথ অত্যন্ত দুর্গম আর বিপজ্জনক। পা ফসকে নিচে পড়লে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। কাজেই পাহাড়ে চড়ার অভিজ্ঞতা না থাকলে ওপরে ওঠার চেষ্টা না করাই ভালো।

Please follow and like us:
0

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

CAPTCHA


error: Content is protected !!