কীভাবে একজন ভালো পর্যটক হয়ে উঠবেন ?

ভ্রমণের নেশা মানুষের বেশ পুরোনো। যখন এত আধুনিক প্রযুক্তি বা যানবাহন ছিল না, তখনো মানুষ পায়ে হেঁটে বা জাহাজে চড়ে ভ্রমণে বেরিয়েছে। পর্যটকরা এক দেশ থেকে আরেক দেশে গিয়েছেন মানুষের সংস্কৃতি, ভাষা সম্পর্কে জানতে। সেগুলো লিখেও রেখেছেন তাঁরা। কীভাবে একজন ভালো পর্যটক হওয়া যায়, সে বিষয়ে বেশ কিছু তথ্য জানিয়েছে উই থ্রি ট্র্যাভেল ডটকম।

মানচিত্র সম্পর্কে জানুন

ভ্রমণে বের হওয়ার আগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো ভূগোলটা ঠিকমতো জেনে নেওয়া। সেটা দেশে হোক কিংবা দেশের বাইরে অন্য কোথাও। সবার আগে মানচিত্রটা ভালো করে দেখে নিতে হবে। তাহলে আপনি বুঝতে পারবেন কোথা থেকে আপনাকে শুরু করতে হবে বা আসলে আপনি কী দিয়ে শুরু করতে চান। কারো আগ্রহ থাকে দর্শনীয় স্থান দেখার প্রতি, কারো থাকে ভাষা এবং সংস্কৃতির প্রতি, কেউ আবার রাজনৈতিক ইতিহাসকে গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। নিজের লক্ষ্য ঠিক করুন, শুধুই ঘুরে বেড়ানো পর্যটকের কাজ নয়। বরং ভ্রমণ থেকে শেখাটাই পর্যটকের কাজ।

সঠিক পরিকল্পনা

হুট করে ঘুরতে বেরিয়ে যাওয়াটা পর্যটকের লক্ষণ নয়। বরং ভেবেচিন্তে সময় বের করে আগে থেকে পরিকল্পনা করে ঘুরতে যাওয়াটাই একজন পর্যটকের কাজ। আর সেজন্য প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা। কোথায় কোথায় যাবেন, কয়দিন থাকবেন, থাকার কী ব্যবস্থা, কত টাকা খরচ হবে সব মিলিয়ে নিয়ে বেরিয়ে পড়াটাই একজন ভালো পর্যটকের লক্ষণ।

ভাষা শেখা

শুধু যে নিজের গণ্ডির মধ্যে ঘুরে বেড়াবেন ব্যাপারটা তো সে রকম নয়। পর্যটকদের ঘোরার নেশা কোনো সীমানায় আটকে থাকে না। তাই ঘোরার সুবিধার্থেই কয়েকটি ভাষা শিখে নিতে পারেন। এমন না যে সবগুলো ভাষাই আপনাকে অনর্গল বলতে বা বুঝতে হবে। কাজ চালিয়ে নেওয়ার জন্য যতটুকু দরকার, ততটুকু হলেই চলবে। এতে আপনি যেখানেই যান সেখানকার মানুষের সংস্কৃতি এবং সমাজব্যবস্থা ভালোমতো বুঝতে পারবেন।

টাকা জমানো

ভ্রমণের জন্য অর্থ প্রয়োজন । টাকা না থাকলে ঘুরতে যাওয়ার সুযোগ এলেও কাজে লাগাতে পারবেন না। তাই সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে তুলুন । বছরের নির্দিষ্ট সময়ে ঘুরতে বেরিয়ে পড়ুন আর তার আগে টাকাটা জমিয়ে ফেলুন যাতে কোনো কিছু মিস না হয় ।

বই পড়ুন

ভালো পর্যটক হতে গেলে আপনাকে লেখাপড়া করতে হবে । প্রচুর বই পড়তে হবে বিভিন্ন দেশের ভূগোল, ভাষা এবং সাহিত্য সম্পর্কে জানতে হলে । সেটা কাগজে বই হোক কিংবা অনলাইনে বসে পড়া হোক ।পড়ার অভ্যাস না থাকলে আপনার মধ্যে ভ্রমণের আগ্রহ তৈরি হবে না ।

বেরিয়ে পড়ার আগে

সময় আর সুযোগ এক করতে পারলে বাউণ্ডুলে মন বেরিয়ে পড়তে চায় নতুন কিছু দেখতে। তা সে দেশে হোক বা বিদেশে। অপরিকল্পিতভাবে বেরিয়ে পড়ার মধ্যেও আছে অ্যাডভেঞ্চার। কিন্তু অনাকাঙ্ক্ষিত বিপদ এড়াতে কিছুটা পরিকল্পনা করে যাওয়াই উত্তম । ঝামেলা এড়াতে হয়ত দ্বারস্থ হয়েছেন ট্যুর এজেন্টের কাছে। কিন্তু কিছু পরিকল্পনা নিজেকে তো অবশ্যই করে ফেলতে হয়।

খোঁজ খবর নিন

যেখানে যেতে চান আগে থেকেই সেখানকার আবহাওয়া ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি জেনে নিন। সেখানে পরিচিত কেউ থাকলে তো ভাল, না থাকলে ইন্টারনেটে খুঁজুন, পেয়ে যাবেন । সাহায্য নিতে পারেন মানচিত্র অথবা গুগুল ম্যাপের । স্ট্রিটভিউ-এ পেয়ে যেতে পারেন আগাম বিবরণ ।

ব্যাগ বোঁচকা

পর্যটন বান্ধব ব্যাগ নেওয়ার অভ্যেস করুন। প্রয়োজনের বাইরে অতিরিক্ত কাপড় নেওয়া থেকে বিরত থাকুন । নইলে বিড়ম্বনাই বাড়াবে শুধু ।

ফিরতি পথে

নিয়ন্ত্রিত পরিকল্পনা থাকলে ফিরতি টিকেট কিনে রাখুন । না হলে অন্তত কোথায় এবং কিভাবে ফেরত আসবেন সেটা নিশ্চিত হয়ে নিন ।

পকেট সাবধান

ট্যুরে গিয়ে এটিএম সুবিধা পাবেন কিনা তা জেনে রাখুন। সঙ্গে নগদ কিছু টাকা রাখাও নিরাপদ। সব টাকা একসঙ্গে না রেখে আলাদা আলাদা ব্যাগ বা চেম্বারে রাখুন। তবে অবশ্যই একটা প্ল্যান-বি রেডি রাখবেন। বিপদে আপদে কাজে দিবে।

পাসপোর্ট ভিসার কপি সঙ্গে রাখুন

দেশের বাইরে গেলে পাসপোর্ট এবং ভিসা, ভ্রমণ বিমা ইত্যাদি ফটোকপি ও স্ক্যান করে সঙ্গে রাখুন । তবে তা কোনোভাবেই লাগেজে রাখতে যাবেন না । লাগেজ হারিয়ে গেলে বেশ কঠিন সময়ের মুখোমুখি হতে হবে বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে । নথিপত্র স্ক্যান করে মেইলেও অ্যাটাচ করে রাখতে পারেন ।

আগন্তুক থেকে সাবধান

ভ্রমণসঙ্গী বাদে সবাই আপনার কাছে আগন্তুক। তাই দুশ্চিন্তা নয় প্রয়োজন সাবধানতা। অপরিচিত কারো সাথে নিশ্চিত না হয়ে কোন কিছু বিনিময় না করাটাই নিরাপদ। নতুন জায়গায় নতুন করা কারো সাথে সখ্যতা হওয়া মন্দ নয়। তবে সাবধানেরও মার নেই।

ফার্স্ট এইড অপরিহার্য প্রসাধনী

প্রয়োজনীয় ওষুধ সঙ্গে নিন।  তাছাড়া সঙ্গে নিতে পারেন ব্যান্ডএইড, ব্যান্ডেজ, এন্টিসেপ্টিক জাতীয় ওষুধপত্র ।  অপরিহার্য প্রসাধনীগুলোই শুধু সঙ্গে নিন । তাছাড়া শুধু শুধু ব্যাগ ভারী হলে আপনি নিজেই সমস্যায় পড়বেন ।

প্রাচুর্যতা পরিহার করুন

কোথাও ভ্রমণে গিয়ে বিত্ত-বৈভব কিংবা আপনার প্রাচুর্যতা দেখাতে গেলে হিতে বিপরীত হতে পারে ।দামি জিনিসপত্র বিশেষ করে স্বর্ণালঙ্কার ও ক্যামেরার কারণে ছিনতাইকারীদের টার্গেট হতে পারেন আপনি ।

আণুষঙ্গিক

ট্যুরিস্ট রিসোর্ট হোক বা কোনও এক্সোটিক জায়গা, বিনোদন আর অ্যাডভেঞ্চার জারি রাখতে সঙ্গে নিতে পারেন গিটার বা অন্য কোনও বাদ্যযন্ত্র। এ ছাড়া রাখুন কিট ব্যাগ, টর্চ লাইট, দিয়াশলাই, শুকনো খাবার। বই অথবা বাইনোকুলারও নিতে পারেন। মশা তাড়ানোর ক্রিমটা থাকলেও মন্দ নয়।

যন্ত্রসঙ্গী

নিতে ভুলবেন না হাতঘড়ি, মোবাইল ফোন, ক্যামেরা, চার্জার, ই-বুক রিডার, পোর্টেবল চার্জার, গান শোনার যন্ত্র। তবে দরকার না পড়লে শুধু শুধু ব্যাগ ভারি করবেন না । ক্যামেরার সঙ্গে প্রয়োজন না হলে একাধিক লেন্স না নেওয়াই ভাল।

বিদেশ ভ্রমণে সতর্কতা

নির্দোষ আচরণও আপনাকে বিপদে ফেলতে পারে । বিশ্বের বিভিন্নস্থানে ভ্রমণে গেলে আপনার ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে। কোনো দেশে আপনার যে আচরণ ভদ্রতা বলে গন্য হবে অন্য দেশে সে আচরণটিই চরম অভদ্রতা বা হুমকি প্রদান বলে ধরে নেওয়া হবে। তবে স্বাভাবিক কিছু ভদ্রতাসূচক কথাবার্তা যেমন, ‘হ্যালো’, ‘গুডবাই’, ‘প্লিজ’, ‘থ্যাংক ইউ’, ‘এক্সকিউজ মি’ ইত্যাদির চল প্রায় সব দেশেই আছে। এ বিষয়ে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ফক্স নিউজ। কোনো দেশ ভ্রমণে যাওয়ার আগে এসব বিষয়ে খবর নিয়ে নেবেন আগে থেকেই।

হাতের ইশারা আপনাকে বিপদে ফেলতে পারে

বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে হাতের ইশারা বা অঙ্গভঙ্গী আপনাকে বিপদে ফেলতে পারে। ধরুন ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোতে গিয়ে আপনি একটি হোটেলে খাবারের জন্য বসেছেন। ওয়েটার খাবার দেওয়ার পর আপনি যদি তাকে একটি ‘ওকে’ সাইন দেখান তাহলেই সর্বনাশ। আপনার কড়ে আঙ্গুল ও তর্জনি একত্রে করে ইংরেজি ‘ও’-এর মতো করা চিহ্নটিকে তিনি খুবই বাজে একটি অঙ্গভঙ্গী হিসেবেই ধরে নেবেন । কড়ে আঙ্গুল দেখিয়ে কোনোকিছুর প্রশংসা করাও অনেক দেশে ‘কাঁচকলা’ দেখানোর মতো ধরা হয় । এসব অঙ্গভঙ্গী যেমন ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ভিন্ন, তেমনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইউরোপের অঙ্গভঙ্গীর অর্থেও তফাৎ রয়েছে ।

আপনি কি স্পর্শ করতে ভালোবাসেন ?

কারো সঙ্গে দেখা বা কথা বলার ক্ষেত্রে হাত ধরতে বা পিঠ চাপড়ে দিতে অনেকেই পছন্দ করেন। কিন্তু এ বিষয়টি অনেক দেশে খুবই বিব্রতকর হিসেবে ধরা হয় ।  মার্কিনিরা স্পর্শ করার ক্ষেত্রে কিছুটা উদার হলেও ইউরোপের নানা দেশ এক্ষেত্রে রক্ষণশীল । এমনকি কোনো কোনো দেশে কারো দেহ স্পর্শ করলে আপনার বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়াও সম্ভব  ইটালি ও ফ্রান্সে কারো সঙ্গে দেখা হলে চোখে চোখ রাখা ও পরস্পরকে স্পর্শ করা আন্তরিকতার প্রকাশ । কিন্তু চীন ও জার্মানিতে কাউকে স্পর্শ করা হলে অন্যকে তা অস্বস্তিতে ফেলবে । নাইজেরিয়ার মতো দেশে চোখে চোখ রাখা মানে বেয়াদবি ও হুমকি প্রদান ।

টেবিলে বসার অভ্যাস ঠিক করুন

আপনি কি টেবিলে কনুই রেখে বসে অভ্যস্ত ? কিংবা আপনার মা যেভাবে শিখিয়েছেন, খাওয়ার আগে সেভাবে খাবারের প্লেট মুছে নিতে অভ্যস্ত আপনি ? বিদেশে গেলে এসব অভ্যাস ঠিকভাবে পর্যালোচনা করুন । কোনো কারণ ছাড়াই আপনার এসব আচরণে বিপদে পড়তে পারেন আপনি । মধ্যপ্রাচ্য, ভারত ও আফ্রিকার কিছু অংশে বাম হাত দিয়ে টেবিলের কোনো কিছুই ধরতে পারবেন না আপনি । কারণ একে নোংরা হিসেবেই বিবেচনা করা হয়। চীনে চপস্টিক দিয়েই ভাত খাওয়ার নিয়ম । কিন্তু থাইল্যান্ডে এ নিয়মটি সঠিক নয় হিসেবেই বিবেচনা করা হয় । সেখানে আপনাকে চামচ ব্যবহার করতে হবে । ব্রাজিল ও চিলিতে আপনার হাত দিয়ে কোনোকিছুই খাওয়া উচিত নয় । এমনকি ফ্রাইও । ইটালি ও কিউবাতে খাওয়া শেষ হওয়ার আগে চামচ ও ছুরি প্লেটের ডানপাশে ভুলেও রাখবেন না । সেগুলো প্লেটের ডান পাশে রাখা হলে ওয়েটার বুঝে নেয় আপনার খাওয়া শেষ হয়ে গেছে । কিন্তু স্পেনে এ নিয়মটি ভিন্ন । সেখানে চামচ ও ছুরি প্লেটে রেখে দিলে ওয়েটার মনে করবে আপনার খাওয়া শেষ ।

বহু দেশেই টেবিলে উপস্থিত বয়স্ক ব্যক্তি বা আমন্ত্রণকারি খাওয়া শুরু করা পর্যন্ত অপেক্ষা করা ভদ্রতার একটি অংশ ।

বখশিশ দিতে চান ?

যুক্তরাষ্ট্রে মোট বিলের ১৫ ভাগ ওয়েটারদের জন্য ‘টিপস’ হিসেবে টেবিলে রেখে দেওয়াই ভদ্রতা (সার্ভিস খুব খারাপ হলে ভিন্ন বিষয়)। কিন্তু অনেক দেশে বিলের মধ্যেই বখশিস সংযুক্ত করা হয় । অনেক দেশে আবার টিপস দেওয়ার চেষ্টা করলে বিপদে পড়তে পারেন ।

জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও ব্রাজিলে রেস্টুরেন্টে খাওয়ার পর বখশিস দেওয়ার কোনো দরকার নেই । এটা ওয়েটারদের আত্মসম্মানে ঘা দিতে পারে ।

ইটালি, ফ্রান্স ও জার্মানিতে বিলের ৫ থেকে ১০ ভাগ বখশিস দিতে পারেন  । তবে এ হার কিছুটা বাড়াতে হবে মিশর, দক্ষিণ আফ্রিকা ও হং কং ভ্রমণে গেলে । এসবস্থানে খাওয়ার বিলের ১০ থেকে ১৫ ভাগ বখশিস না দিলে আপনি কিছুটা অভদ্র বলে বিবেচিত হবেন । তবে চীনের ভেতর রেস্টুরেন্টগুলোতে বখশিস দেওয়ার কোনো দরকার নেই ।

শরীরের ভাষাকে অবহেলা করবেন না

সুইজারল্যান্ডে ভ্রমণ করতে যাবেন ? সেখানে তীব্র ঠাণ্ডা হলেও কারো সঙ্গে কথা বলার সময় পকেটে হাত ঢুকিয়ে রাখবেন না । এটি সেখানে অভদ্রতা ।

যুদ্ধের কথা মনে করবেন না

বিদেশে ভ্রমণে গিয়ে নানা ধরনের মানুষের সঙ্গে পরিচিত হতে হবে আপনাকে। তাদের মতামতও ভিন্ন হবে, এটাই স্বাভাবিক। তাদের সঙ্গে যুদ্ধ, স্ক্যান্ডাল, রাজপরিবার, রাজনীতি, ধর্ম ও কূটনৈতিক বিষয় নিয়ে ভুলেও আলোচনা করবেন না। এসব আলোচনা আপনাকে বিপদে ফেলতে পারে।

Please follow and like us:
0

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

CAPTCHA


error: Content is protected !!