কাশ্মীরের ঐশ্বর্য ভেরিনাগ

পাহাড় থেকে নেমে আসা একটা ঝরনা একটা কুণ্ডে জমা হওয়ার পরে  আবার বেরিয়ে যাচ্ছে চিনার বাগানের ভেতর দিয়ে, সুন্দর বাঁধানো খালের পথ ধরে।  সামনে ছিলো সুবিশাল বাগান, যা এখন শুধু অনুভব করা যায়, কারণ সেই বিশালত্ব এখন আর নেই।  এই বাগানের  নাম ভেরিনাগ (কিংবা বেরিনাগ) যার অর্থ হলো কুণ্ডলী পাকানো সাপ।

এই কুণ্ডের জলের রঙ নীল । জলের ভেতরে অনেক মাছ ঘুরে বেড়ায়। জলের পাশে হেঁটে বেড়ানোর জন্য আছে আচ্ছাদন – রেলিং।  সেখান থেকে ঝুঁকে পড়ে দেখছিলাম স্বচ্ছ নীল জলের কুণ্ড।  জল কেবলই গড়িয়ে আসছে পাহাড় থেকে আর তির তির করে গড়িয়ে যাচ্ছে বাইরে ! সেই প্রবাহ এখানে নাম নিচ্ছে ঝিলাম। ঝিলম নদীর প্রধান উৎস এই প্রস্রবণ। বলা হয়, ঝিলাম নদীই হলো জম্মু-কাশ্মীরের জীবনরেখা।  একটি নদীর উৎসমুখ দেখতে পাওয়া সৌভাগ্য বলেই মনে হয় !

সম্রাট জাহাঙ্গীর ও তাঁর পুত্র সম্রাট শাহজাহানের প্রিয় স্থান ছিল এই ভেরিনাগ।  যুদ্ধবিগ্রহে বিধ্বস্ত জাহাঙ্গির স্বাস্থ্যোদ্ধার করার উদ্দেশ্যে বেরিয়েছিলেন কাশ্মীর ও কাবুল ভ্রমণে।  প্রথমে কাবুল, সেখান থেকে কাশ্মীর। কিন্তু কাশ্মীরে ভয়ানক ঠাণ্ডার কারণে ফিরে যেতে চাইলেন কাবুলে। কিন্তু কাবুলে আর যাওয়া হলো না, ফেরার পথে কাশ্মীরেই মৃত্যু হলো তাঁর। জাহাঙ্গীর মৃত্যু শয্যায় শুয়ে বলেছিলেন, তাঁকে যেন ভেরিনাগে ঝর্নার ধারে সমাধিস্থ করা হয়।

জাহাঙ্গির মারা যান ১৬২৭ সালের ২৮ অক্টোবর।  তখন কাশ্মীর জুড়ে শীতের প্রকোপ শুরু হয়েছে, পড়ছে বরফও। রাস্তা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ফলে আর তাঁর মরদেহ নিয়ে ভেরিনাগে যাওয়া সম্ভবপর হলো না। তাঁকে সমাধিস্থ করা হলো লাহোরের অদূরে এক নির্জন স্থানে।  শেষ ইচ্ছা পূরণ হলো না সম্রাটের।

তাঁর পুত্র সম্রাট শাহজাহান এই ভেরিনাগ কুণ্ডকে কেন্দ্র করে একটি মোগল গার্ডেন গড়ে তুলেছিলেন যা আজ প্রায় লুপ্ত হতে বসেছে।  শুধু জেগে আছে অজস্র চিনার গাছ, যারা ইতিহাসের সাক্ষ্য দিতে আজও প্রস্তুত হয়েই আছে !

ভেরিনাগের দেওয়ালে লাগানো আছে এক ফলক,যাতে লেখা আছে : ” ঈশ্বরের প্রশংসা করি ! কী সুন্দর এই নহর, কী অসাধারণ এই জলপ্রপাত ! বিশ্বের সম্রাট, তাঁর সময়ের সর্বোত্তম প্রভু – তাঁর আদেশে, নির্মিত হলো এই নহর যা স্বর্গোদ্যানের জলধারার সমতুল্য, আর এই জলপ্রপাত হলো কাশ্মীরের ঐশ্বর্য !”

শ্রীনগর শহর থেকে আশি কিলোমিটার দক্ষিণে অনন্তনাগ জেলায় এই চমৎকার প্রস্রবণ, তবে ভ্রমণার্থীর সংখ্যা অনেক কম । ·

Please follow and like us:
0

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

CAPTCHA


error: Content is protected !!