কম খরচে যখন তখন বিদেশ

উজ্জয়ন্ত প্যালেস

অনেক ভ্রমণপিপাসু মানুষ খরচের কথা চিন্তা করে বা সময়ের অভাবে দেশের বাইরে ঘুরতে যাওয়ার ইচ্ছা পূরণ করতে পারেন না।  তাদের ইচ্ছা পূরণে সাহায্য  করার জন্য  আজকের এই লেখা।  আপনার পাসপোর্ট ও ভারত প্রবেশের ভিসা থাকলে আজকেই দিতে পারেন একটা  বিদেশ  ট্যুর।  ‘আগরতলা মানে চৌকির তলা’ এই  প্রবাদ বাক্যটি প্রমাণ করে জীবনে যুক্ত করতে পারেন বিদেশ ভ্রমণের গল্প।

আগরতলা হচ্ছে ভারতের দ্বিতীয় ক্ষুদ্রতম রাজ্য ত্রিপুরার রাজধানী।  বাংলাদেশ জন্মের ইতিহাসে স্থান পাওয়া এই  শহরটি দেখতে দেশের যেকোনো স্থান থেকে ট্রেনযোগে আখাউড়া স্টেশনে নেমে রিকশা কিংবা অটোরিকশায়  পৌঁছে যাবেন সীমান্ত চেকপোস্টে।  চেকপোস্টের আনুষ্ঠানিকতা সেরে আবার অটোরিকশায় চড়ে সোজা চলে যাবেন আগরতলা শহরে । এখানে আগরতলা ভ্রমণের একটা ভিডিও আছে,দেখে নিন

আগরতলায় গিয়ে আপনি অবাক হবেন সেখানকার মানুষের  কথা বলার ঢং ও আচার-আচরণে।  কারো কারো হয়তো মনেই হবে না, এটি বাংলাদেশের বাইরের একটি  দেশের রাজ্যের রাজধানী  শহর।  বাংলাদেশিদের জন্য সেখানে অভ্যর্থনা ও আন্তরিকতার কোনোই কমতি হয় না।

আগরতলা শহর এবং এর বাইরে রয়েছে চমৎকার সব দর্শনীয় স্থান।  আর এগুলোতে বেড়ানোর উপযুক্ত সময়  অক্টোবর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত।  গোটা কয়দিন সময়  নিয়ে বেড়ালে  ত্রিপুরা  রাজ্যের সবুজের মায়ায় মুগ্ধ হবে যে কোনো পর্যটক।

রাজ্যের দর্শনীয় স্থাপত্যকলা, নদী,জলাশয়,বন, ছোট ছোট পাহাড় আর শহরের নিরবতা ঘুরতে আসা মানুষকে ভিন্ন স্বাদের জোগান দিবে।

ভ্রমণের যাত্রা শুরু হতে পারে আগরতলা থেকেই।  পুরো রাজ্যের ঐতিহ্যবাহী ও দর্শনীয় সকল স্থাপনাগুলোর হুবহু নকল করে আগরতলার মালঞ্চনিবাস এলাকায় গড়ে তোলা হয়েছে হেরিটেজ পার্ক।  সবুজ গাছ-গাছালি ঘেরা নিরব এ পার্কে আধা ঘন্টা ঘুরলে দেখা হবে পুরো ত্রিপুরা রাজ্যের দর্শনীয় স্থানের রেপ্লিকা ।

আগরতলা শহরের ভেতরেই কম খরচে অল্প সময়ে তিনটি দর্শনীয় স্থান হচ্ছে উজ্জয়ন্ত প্যালেস, শত বছরের পুরোনো জগন্নাথ মন্দির, মা উমাশ্বরী মন্দির।  শহরে চলতে চলতে পাওয়া যাবে ঘাপটি মেরে থাকা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি।

বিদেশে এসে কিছু কেনা হবে না তা হয় না।  একটু ব্যয়বহুল হলেও বিগ বাজার, সি বাজারের মত শপিং মলে কিছু কেনাকাটা করলে আপনার বিদেশ ভ্রমণের  ষোল কলা পূরণ হবে।

কোথায় ঘুরবেন ?

উজ্জয়ন্ত প্যালেস

আগরতলা শহরের প্রাণকেন্দ্রে প্রায় আধা মাইল এলাকাজুড়ে দ্বিতল এই প্রাসাদটি অবস্থিত।  মিশ্র স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত প্রাসাদটির তিনটি গম্বুজ ঘিরে রয়েছে মুঘল আমলের খাঁজকাটা নকশা যার মাঝেরটি ৮৬ ফুট উঁচু। ১৮৯৯ সালে এই সুদৃশ্য ও মনোরম প্রাসাদের নির্মাণ কাজ শুরু হয় এবং শেষ হয় ১৯০১ সালে।  ওই সময়ই এর নির্মাণ ব্যয় ছিল ১০ লাখ ভারতীয় রুপি।  মহারাজা রাধা কিশোর মানিক্য বাহাদুর উজ্জয়ন্ত প্রাসাদ নির্মাণের মূল উদ্যোক্তা।  প্রধান ভবনটির দু’পাশে দুটি দীঘি।  দীঘির পাড়ে সেগুন, শিরিষ, কড়ই আর শাল গাছের সাজানো অরণ্য। প্রাসাদের প্রবেশপথের ঠিক মাঝখানে রয়েছে ফোয়ারা আর ভাস্কর্যসমৃদ্ধ একটি চমৎকার বাগান।  প্রাসাদের ভেতরে সারি সারি কক্ষ। এগুলোর প্রতিটির রয়েছে আলাদা আলাদা নাম- শ্বেতমহল, লালমহল, সদর বাড়ি, তহবিল খানা, আরাম ঘর, পান্থশালা প্রভৃতি। এই প্রাসাদের নামকরণ করেছিলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। কুঞ্জবন প্রাসাদ

উজ্জয়ন্ত প্রাসাদের একমাইল উত্তরে মহারাজা বীরেন্দ্র কিশোর মানিক্যের নির্মিত (১৯০৯ থেকে ১৯২৩ সালে) ছবির মতো সুন্দর কুঞ্জবন প্রাসাদ হচ্ছে আগরতলার আরেকটি চমৎকার স্থাপত্যকর্ম।  এ প্রাসাদটি আসলে তৈরি করা হয়েছিল বিভিন্ন মহারাজা এবং তাদের অতিথিদের অবকাশ যাপন ও নির্জনবাসের জন্য।  ১৯২৬ সালে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আগরতলায় তার সপ্তম ও শেষ সফরে কুঞ্জবন প্রাসাদের পূর্বদিকের অ্যাপার্টমেন্টে অবস্থান করেন।  এই পূর্বাংশের সঙ্গে সংযুক্ত গোলাকার বারান্দার শেষ সীমানা থেকে বড়মুড়া পাহাড়ের দূরবর্তী দৃশ্য দেখা যায়।  কুঞ্জবন প্রাসাদের উত্তর-পূর্বদিকেই রয়েছে বিলাসবহুল রিসোর্ট এবং মানিক্য শাসনামলের ত্রিপুরা রাজাদের বিশ্রামাগার মালঞ্চ নিবাস। এখানে ভূ-গর্ভস্থ কক্ষও রয়েছে।

নীরমহল

অনেকের মতেই ত্রিপুরা রাজ্যের সেরা পর্যটন কেন্দ্র হলো নীরমহল।  এখানে না গেলে কিন্তু পুরোপুরি বৃথা যাবে ত্রিপুরা ভ্রমণ।  রাজধানী আগরতলা থেকে প্রায় ৫৩ কিলোমিটার দূরে এর অবস্থান।  রুদ্র সাগর নামে একটি লেকের ঠিক মাঝখানে রূপকথার রাজপ্রাসাদের মতো দাঁড়িয়ে আছে নীরমহল।  নৌকায় চড়েই আপনাকে পৌঁছতে হবে স্বপ্নের নীরমহলে।  সমগ্র উত্তর-পূর্ব ভারতের একমাত্র জলবেষ্টিত প্রাসাদ এটি।  সাগরমহল নামে একটি সরকারি পর্যটক নিবাস রয়েছে রুদ্র সাগরের পূর্ব তীরে, যার অবস্থান একেবারে নীরমহলের মুখোমুখি।  নীরমহল প্রাসাদ ও রুদ্র সাগর কোনোটিই সৌন্দর্যের বিচারে কারোর চেয়ে কম নয়।  আর রাতের নীরমহলের সৌন্দর্য তো এককথায় অতুলনীয়।  দূর থেকে দেখে মনে হবে যেন কল্পলোকের স্বপ্ননগরী।  পুরো ভবনে এমনভাবে আলোকসম্পাত করা হয় যে, মনে হবে পানিতে ভাসছে দক্ষ শিল্পীর হাতেগড়া কোনো সোনালি রাজহাঁস। আর জোছনা রাত হলে তো কথাই নেই।  রুদ্র সাগরে নৌবিহার আপনার ভ্রমণের আনন্দ দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেবে।  জায়গাটির নাম নীরমহল কেন হলো এমন প্রশ্ন আসতে পারে যে কারো মনে।  চতুর্দিকে ‘নীর’ অর্থাৎ পানির মধ্যে প্রাসাদটির অবস্থান বলেই এর নাম হয়েছে নীরমহল।  নির্মাতা মহারাজা বীরবিক্রম কিশোর মানিক্য এই নামকরণ করেন।  এখানে একরাত না থাকলে কিন্তু সৌন্দর্যের আসল রূপ উপভোগ করা যাবে না।  থাকা-খাওয়ার জন্য সাগরমহল পর্যটক নিবাসের ওপর নিশ্চিন্তে নির্ভর করতে পারেন।  সরকারি প্রতিষ্ঠান হওয়ায় খরচটাও খুব বেশি নয়।

সিপাহীজলা ওয়াইল্ডলাইফ স্যাংচুয়ারি

আগরতলা শহর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থান এই অভয়াশ্রমের।  বিশাল এলাকাজুড়ে অবস্থিত অভয়াশ্রমে রয়েছে নজরকাড়া সব পাখি ও বানর।  এখানে আছে বোটানিক্যাল গার্ডেন, চিড়িয়াখানা, লেক এবং বিপুল প্রজাতির বৃক্ষ।  অভয়াশ্রমটি সারাবছরই ঘন সবুজ বৃক্ষরাজিতে আচ্ছাদিত থাকে।  সাধারণ বানরের পাশাপাশি এখানে দেখা যাবে ক্ষুদ্র লেজবিশিষ্ট বানর, ক্যাপড লেঙ্গুর, চশমাপরা লেঙ্গুর প্রভৃতি।  বন্যপ্রাণীর অভয়াশ্রমের পাশাপাশি একটি গবেষণা কেন্দ্রও রয়েছে।  ১৫০ প্রজাতির স্থানীয় ও অতিথি পাখির কলকাকলি আপনার চোখে মুগ্ধতার পরশ বুলিয়ে দেবে।  অভয়াশ্রমের বিভিন্ন অংশের মধ্যে রয়েছে একেক প্রকার প্রাণী ও পাখির জন্য একেক প্রকার আবাসস্থল।  যেমন- স্তন্যপায়ী প্রাণী, মাংসভোজী প্রাণী ও কুমিরের আবাসস্থল, পক্ষীশালা প্রভৃতি।  অভয়াশ্রমটির সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে দিয়েছে এখানকার লেকগুলো।  আবাসারিকা এবং অমিত সাগর লেকে রয়েছে নৌকায় ঘুরে বেড়ানোর সুবিধা।

কমলাসাগর লেক

বাংলাদেশ সীমান্তের কাছাকাছি একটি বিশাল লেক যা পঞ্চদশ শতাব্দীতে খনন করেছিলেন মহারাজা ধন্য মানিক্য।  এই লেকের সীমানায় ষোড়শ শতাব্দীতে নির্মিত বিখ্যাত কালি মন্দির অবস্থিত।  প্রতিবছরের এপ্রিল ও আগস্ট মাসে মন্দির প্রাঙ্গণে বিশাল মেলা অনুষ্ঠিত হয়।  যা দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে ভিড় জমান অনেক ভক্ত ও পর্যটক।  নজরকাড়া প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য কমলাসাগর লেক সমগ্র ত্রিপুরা রাজ্যের সেরা পিকনিক স্পটগুলোর একটি।  ধর্মীয় কারণে এটি ভারত ও ভারতের বাইরের পূণ্যার্থীদের কাছে এক বিশেষ আকর্ষণ।  আগরতলা শহর থেকে এর দূরত্ব ৩০ প্রায় কিলোমিটার।

 

ডাম্বুর লেক

আগরতলা শহর থেকে প্রায় ১২০ কিলোমিটার দূরে ডাম্বুর লেকের অবস্থান।  চোখজুড়ানো বনানীতে আচ্ছাদিত ৪১ বর্গ কিলোমিটারের এই জলাভূমির সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে দিয়েছে এরমধ্যে অবস্থিত ৪৮টি দ্বীপ।  বাড়তি আকর্ষণ হিসেবে রয়েছে অতিথি পাখির কলকাকলি আর বিভিন্ন জলক্রীড়ার সুবিধা।  এই লেকের কাছাকাছি গোমতী নদীর উৎসমুখে (তীর্থমুখ) রয়েছে একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প।  এখানে প্রতিবছরের ১৪ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় বিখ্যাত ‘পৌষসংক্রান্তি মেলা’।  ডাম্বুর লেকে এসে মিলিত হয়েছে আলাদা দুটি নদী- রাইমা ও সারমা।  শীতকালে এখানে জড়ো হয় বিচিত্র প্রজাতির অতিথি পাখি।

জাম্পুই হিলস

জাম্পুই হিলসের স্থানীয় আদিবাসী রিয়াং সম্প্রদায়

অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর শীতল আবহাওয়ার জন্য জাম্পুই হিলস হয়ে উঠেছে ত্রিপুরা রাজ্যের শীর্ষস্থানীয় পর্যটন কেন্দ্রগুলোর একটি।  আগরতলা থেকে প্রায় ২১৮ কিলোমিটার দূরে এলাকাটির অবস্থান।  সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা প্রায় ৩ হাজার ফুট।  এর উত্তর পাশে বাংলাদেশের সিলেট বিভাগ এবং দক্ষিণ পাশে চট্টগ্রাম বিভাগের অবস্থান। জাম্পুই রেঞ্জ পড়েছে দুই প্রতিবেশী ভারতীয় রাজ্য ত্রিপুরা ও মিজোরামের মাঝখানে।  জাম্পুই হিলসের স্থানীয় অধিবাসীরা হলো ত্রিপুরার আদিবাসী রিয়াং ও সিকাম সম্প্রদায়।  সিকামরা আবার আবাস গেড়েছে দশটি গ্রামে যেগুলোর নাম হলো ফুলডাং সাই, চাবওয়াল, থিয়াং সাং, বাংলা বান, বেহাং চিপ, ভাংমুন, লক্ষ্মী, মুনপুই, মুং হুয়াং ও ভাই সুম। এসব গ্রাম পাহাড়ের বিভিন্ন উচ্চতায় অবস্থিত।  পরিপাটি ও অতিথি পরায়ণ মিজোরা রাজ্যের অন্যান্য আদিবাসীদের চেয়ে শিক্ষিত এবং খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী।  জাম্পুই হিলস এলাকায় উন্নতমানের কমলা উৎপন্ন হয়।  চমৎকার স্বাদ ও রসের কারণে বাজারে এর যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে।  এখানকার মিজোদের বিখ্যাত বাঁশনৃত্য এক নিমেষে আপনার কর্মব্যস্ত জীবনের সব একঘেয়েমি দূর করে মনকে করে তুলবে সতেজ ও প্রাণচঞ্চল।  জাম্পুই হিলসের বেল্টিং সিব হলো সমগ্র ত্রিপুরা রাজ্যের উচ্চতম স্থান।  এখানে দাঁড়িয়ে চারপাশের প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখলে কখন যে কল্পনার রাজ্যে হারিয়ে যাবেন টেরই পাবেন না।  এখানে একটি শিবমন্দির দেখতে পাবেন যা ১৪০০ বছর আগে নির্মাণ করেছিলেন ত্রিপুরা রাজারা। ত্রিপুরাবাসীর কাছে এটি একটি পবিত্র স্থান।

থাকা-খাওয়া 

আগরতলায় থাকার মতো ভালোমানের অনেক হোটেল রয়েছে।  এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো জিঞ্জার হোটেল, হোটেল সোনার তরী, হোটেল সিটি সেন্টার, হোটেল সমরাজ রিজেন্সী, হোটেল গ্রীন টাচ, হোটেল এক্সিকিউটিভ ইন, রয়্যাল গেস্ট হাউস,চারুলতা বুটিক গেস্ট হাউস, হোটেল জয়পুর প্যালেস, হোটেল প্যালেস ইন প্রভৃতি।  ডাম্বুর লেকের কাছাকাছি রয়েছে জাতানবাড়িস্থ রাইমা ট্যুরিস্ট লজ।  জাম্পুই হিলস এলাকায় ইডেন ট্যুরিস্ট লজই প্রধান ভরসা।  তবে সিট কম হওয়ায় অগ্রিম বুকিং দিতে হয়।

Please follow and like us:
0

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

CAPTCHA


error: Content is protected !!