ইয়াঙ্গুন : ইতিহাসের এক রঙিন শহর

একদিন আগে স্বস্ত্রীক ব্যাংককে এসেছি। পরদিন যাওয়ার কথা এককালের ব্যবসা-বাণিজ্যের জনপ্রিয় শহর রেঙ্গুনে (বর্তমান নাম ইয়াঙ্গুন)। বাবার কাছে শুনেছি এক সময় আমার দাদা এবং অনেক আত্মীয়-স্বজন রেঙ্গুনে ব্যবসা-বাণিজ্য এবং চাকরীর সাথে যুক্ত ছিলেন। আমার দাদা নাকি বিয়ের পর টানা ১২ বছর পড়ে ছিলেন রেঙ্গুনে। তাই রেঙ্গুনের প্রতি ছোটবেলা থেকেই আমার একটা স্বপ্ন বুনা হয়ে যায়। তাছাড়া আমার চেহারাও মঙ্গোলয়েড টাইপ। যখন স্কুল কলেজে পড়ি তখন অনেকেই আমাকে উপজাতি কিংবা রোহিঙ্গা ভাবতো। বাবাকে প্রশ্নও করেছিলাম আমাদের পূর্বপুরুষদের কেউ বর্মী নারী বিবাহ করেছিলেন কি না। কিন্তু তাঁর কাছ থেকে এবিষয়ে কোন সদুত্তর পাইনি। তবে বলেছিলেন রেঙ্গুনে এখনো আমাদের আত্মীয়-স্বজন রয়েছেন। যোগাযোগের অভাবে তাদের এখন আর খোঁজখবর নেই।

আমি গত ১৫ বছরে মালদ্বীপ, শ্রীলংকা, ভারত, নেপাল, ভূটানসহ দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার প্রায় ১৪টি দেশে একাধিবার ভ্রমণ করেছি। কিন্তু ভিসা জটিলতা এবং সহজ যাতায়াত রুট না পাওয়ায় এতদিন মিয়ানমার যাওয়া হয়নি।

একসময় রেঙ্গুন ছিল বাঙালি যুবকদের কাছে রঙিন স্বপ্নের শহর। তখন দলে দলে বাঙালি যুবকরা পাড়ি জমাত রেঙ্গুনে। তাই এই রেঙ্গুন নিয়ে তখন রচিত হয়েছে কত গান-কবিতা। বাবা-মা’দের ধারণা ছিল ছেলেরা রেঙ্গুন গেলে ‘দেবানা’ বা বিবাগী হয়ে যায়। সুন্দরী বর্মী মেয়েদের পাল্লায় পড়ে বাবা-মা, পরিবার-পরিজনের কথা ভুলে গিয়ে বাকী জীবন কাটিয়ে দেয় সেখানে। এসব নিয়ে লোককবিরা লিখেছেন

রঙ্গুমের বর্মার মাইয়া/ এত ঠমক জানে/ ঝুঁড়ার আগাত ফুলর কলি/ ইসারাতে টানে/ রঙ্গুম রঙ্গিলারে… কিংবা মায়ে বলে, ওরে অপুত/ রঙ্গুম ন যাইস তুই/ হালের গরু বেচিয়েনে/ বিয়া করাইয়ম মুই/ রঙ্গুম রঙ্গিলারে…। ছোটকালে দাদী এবং বয়োজ্যেষ্ঠ গৃহভৃত্যদের মুখে মুখে এমন গান হামেশাই শুনেছি।

যাইহোক, এবারের ভ্রমণপ্ল্যান মতো এয়ার এশিয়ার ফ্লাইটে করে যাবো আমরা ইয়াঙ্গুনে। ভিসা, টিকিট সব বাংলাদেশ থেকেই করে এসেছি। এখন শুধু যাওয়ার আগে আমাকে থাইল্যান্ডের রি-এন্ট্রি ভিসাটা নতুন করে নিতে হবে, ব্যস্।

ব্যাংককের ডনমিয়ং এয়ারপোর্ট থেকে বিকাল সোয়া ৪টায় আমাদের রেঙ্গুন যাওয়ার ফ্লাইট। নির্ধারিত সময়ের প্রায় ২০ মিনিট পর সেটি আমাদের নিয়ে আকাশে উড়াল দিল। মাঝারি সাইজের বোয়িং এটি। যাত্রী ২৫০ জনের কম নয়। এদের বেশিরভাগই ইউরোপ কিংবা আমেরিকান। কিছু বর্মী এবং বাকীরা এশিয়ার বিভিন্ন দেশের। সেখানে শুধুমাত্র আমরা দু’জন বাংলাদেশী। মাত্র সোয়া ঘণ্টার আকাশপাড়ি। স্থানীয় সময় বিকাল সাড়ে ৫টা নাগাদ এয়ার এশিয়া আমাদের ইয়াঙ্গুন ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে পৌঁছে দিল।

ইমিগ্রেশন নিয়ে আমি একটু চিন্তিত ছিলাম। কারণ সংবাদপত্র বা মিডিয়ার লোকদেরকে মিয়ানমার সহজভাবে গ্রহণ করে না। তাই আমার ভিজিটিং কার্ড, আইডি কার্ডসহ সকল পরিচিতিমূলক কাগজপত্র ব্যাংককের হোটেলের লাগেজে রেখে এসেছি। স্ত্রীকে বললাম ইমিগ্রেশন অফিসার যদি মিয়ানমার ঢুকতে না দিয়ে পুনরায় ব্যাংককে ফেরত পাঠায় তাতে যেন আপসেট না হয়। তবে এত আশঙ্কার পরও খুব সহজেই ইমিগ্রেশনে পার পেয়ে গেলাম। হাঁফ ছাড়লাম বাইরে এসে। আমাদের হোটেল আগেই রির্জাভেশন করা ছিল। ডাউন-টাউনের খুব প্রাইম লোকেশনে ছিল এটি। নাম এশিয়া প্লাজা হোটেল। ১১ তলা এই হোটেলটি অনেক পুরনো হলেও বেশ আধুনিক।

  •    
  • সুয়েডাগন প্যাগোডা এবং অং সান সুচির বাড়ির সামনে আমরা

টেক্সিতে করে হোটেলে যেতে হবে তাই এয়ারপোর্ট থেকেই কিছু ইউএস ডলার মিয়ানমার কিয়াত্-এ এক্সচেঞ্জ করে নিলাম। প্রতি ডলারে পাওয়া গেল ১২শ কিয়াত্। বাপরে, কত্তো টাকা! ৮০০০ কিয়াতে দরদাম করে চড়ে বসলাম টেক্সিতে। তখন প্রায় সন্ধ্যা। সেই এয়ারপোর্ট থেকে শুরু করে রেঙ্গুনের রাজপথে অসংখ্য লুঙ্গি পরা মানুষ দেখে আমার স্ত্রী যারপরনাই বিস্মিত। আমি বললাম, লুঙ্গি হচ্ছে এদের জাতীয় পোশাক। বিষয়টা স্বাভাবিকভাবে দেখার চেষ্টা করো।

হোটেলে উঠে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে পড়লাম ডিনার করতে। তখন রাত ৯টা। এরইমধ্যে পুরো শহর ঘুমিয়ে পড়তে শুরু করেছে। একটু অবাক হলাম। রাস্তাঘাটে মানুষের চলাফেরা কমে এসেছে, দোকানপাটও বন্ধের পথে। পরে জেনেছি রাত ১০টার মধ্যেই রেঙ্গুনের বেশিরভাগ অংশ বন্ধ হয়ে যায়। কি আর করা, পাশের একটি রেস্তোরাঁয় রাতের খাবার সেরে হোটেলে ফিরে এলাম।

দ্বিতীয় দিন একটু সকাল সকালই হোটেল থেকে বেরিয়ে পড়েছি। উদ্দেশ্য মিয়ানমারে বৌদ্ধদের সর্বোচ্চ পবিত্র ধর্মীয়স্থান সোয়েডাগন প্যাগোডাসহ কিছু দর্শনীয় স্থান দেখতে যাব। টেক্সি ডেকে চড়ে বসলাম সোয়েডাগনের উদ্দেশ্যে। আমাদের হোটেল থেকে খুব বেশি দূরে না হলেও ঘোর পথে প্রায় ৩০ মিনিট লেগে গেল সেখানে পৌঁছাতে। ইয়াঙ্গুনের বেশীরভাগ রাস্তা ওয়ানওয়ে এবং স্ট্রেইট। ভাড়া গুণতে হলো ৩০০০ কিয়াত্, বাংলাদেশি টাকায় ২০০ টাকা মাত্র। প্যাগোডাটি একটি পাহাড়ের চূড়ায়। এর চারিদিকে লম্বা সিড়ি এবং এলিভেটর রয়েছে। ভেতরে ঢুকার জন্য আমরা জুতা-স্যান্ডেল খুলে অন্যান্য দর্শনার্থীদের সাথে লাইনে দাঁড়ালাম। স্থানীয় লোকদের জন্য প্যাগোড়ায় ঢুকতে টিকিটের প্রয়োজন হয় না কিন্তু বিদেশীদের অবশ্যই টিকিট লাগে। আমার স্ত্রীও আমার মতো মঙ্গোলয়েড চেহারার। ভেবেছিলাম অন্যান্য এশিয়ান দেশের মতো এখানেও তারা আমাদের স্থানীয় লোক মনে করবে। কিন্তু ঢোকার সময় একজন জিজ্ঞেস করলেন ‘ফরেনার’? বললাম হ্যাঁ। তখন দু’জনকে দু’টো টিকেট এবং স্টিকার ধরিয়ে দিলেন। প্রতি টিকিটের মূল্য ৭০০০ কিয়াত্, বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৪৬৫ টাকা। লিফটে করে ৪ তলায় উঠে পৌঁছে গেলাম প্যাগোডার পাদ্দেশে। সোনারঙের ধাতুতে মোড়ানো বিশাল প্যাগোডাটি দেখেই মন জুড়িয়ে গেল। শুনেছি এর অগ্রভাগে রয়েছে ৫৪৪৮টি ডায়মন্ড, ২৩১৭ টি রুবি, সাফায়ারসহ অন্যান্য মূল্যবান পাথর। একদম ওপরের চূড়ায় রয়েছে ৭৬ ক্যারেটের একটি ডায়মন্ড। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা প্যাগোডার চারিদিকে পূজা-অর্চনায় ব্যস্ত। পর্যটকরা ব্যস্ত ছবি তোলায়। আমরা প্যাগোডার শ্বেত পাথরের চত্বরে শুয়ে বসে ছবি তুলে অনেকটা সময় কাটালাম। এবার যাওয়ার পালা।

সোয়েডাগন থেকে টেক্সিতে সোজা চলে গেলাম শেষ মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের সমাধিতে। ১৮৬২ সালে ৮৭ বছর বয়সে তিনি নির্বাসিত ব্রিটিশবন্দী হিসাবে এখানে মৃত্যুবরণ করেন। সে এক করুণ ইতিহাস। সম্রাটের মৃত্যুর অনেক বছর পর তার কবর আবিষ্কৃত হয়। তখন থেকে স্থানীয় মুসলমানরা এখানে আসতে শুরু করে। অনেকে তাঁকে সুফিসাধক হিসাবে গ্রহণ করে মাজারে মানত-জিয়ারত করে থাকে। তাঁর কবরের পাশেই রয়েছে স্ত্রী জিনাত মহল এবং ছেলে মির্জা জওয়ান বখত্ এর কবর। মাজার সংলগ্ন একটি মসজিদও রয়েছে। আমরা টেক্সি থেকে নেমে ভেতরে ঢুকলে মসজিদের ঈমাম আমাদের অভ্যর্থনা জানান এবং পুরো মাজার ঘুরিয়ে দেখান। সেখানে সম্রাটের শেষ জীবনের কিছু ছবি এবং স্ত্রী পুত্রদের ছবিও টাঙানো রয়েছে। জিয়ারত শেষে সম্রাটের কবরের দিকে একপলক তাকিয়ে ভাবতে থাকলাম পরম প্রতাপশালী মোঘল সম্রাজ্যের ইতিহাস এবং বাহাদুর শাহ জাফরের শেষ জীবনে লিখে যাওয়া ঐতিহাসিক করুণ কবিতা বা শের। যেখানে ফুটে উঠেছে মাতৃভূমিতে কবরের মাটি না পাওয়ার করুণ আকুতি। যার ৪টি লাইন এখানে তুলে দিলাম:

কিত্না হ্যায় বদ নসিব ‘জাফর’ দাফন কে লিয়ে দু’গজ জমিন ভি না মিলি ক্যোয়ি ইয়ার মে। সম্রাট জাফরের করুণ পরিণতির কথা ভাবতে ভাবতে দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বেরিয়ে পড়লাম মাজার থেকে। টেক্সি থেকে সোজা চলে গেলাম ইয়াঙ্গুন পোর্টে। সেখানে নদীর তীরে বেশ কিছু সময় কাটিয়ে ফিরে এলাম হোটেলে।

  • বাহাদুর শাহ জাফর, দুই পুত্রসহ জীবনের শেষ দিনগুলোতে রেঙ্গুনে এবং পরের ছবিতে  
  • দিল্লী দরবারে আসীন সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর 

তৃতীয় দিন গেলাম কান্দাওয়াজি লেকে। এখানে বিশাল লেকের চারপাশে গর্জন কাঠের তক্তা দিয়ে বানানো হয়েছে বৈকালিক এবং প্রাতঃ ভ্রমণের জন্য ওয়াকওয়ে। লেকের মাঝখানে রয়েছে ড্রাগন মুখা তরীর মতো সোনা রঙা একটি হোটেল। দেখতে অপূর্ব। লেকের পাড়ে ঘুরাঘুরি শেষে গেলাম স্কর্ট মার্কেট বা বজিঅক অংসান মার্কেটে। মিয়ানমারের পাথর বা রত সারা দুনিয়ায় বিখ্যাত। আর এই মার্কেটেই মিলে অমূল্য সব পাথরখ-। আমার স্ত্রী গো ধরল একটা রুবি কিনবে। কিন্তু মূল্য তালিকা দেখে তা আর কেনার সাহস হলো না। তবে কিছু কাপড়-চোপড় এবং প্রসাধনসামগ্রী কেনা হয়েছে এখান থেকে। সন্ধ্যায় গেলাম আরেক বিখ্যাত প্যাগোড়া সোলে’তে। এটি একদম আমাদের হোটেলের কাছেই ছিল। এর পাশে দেখলাম দু’টো প্রাচীন মসজিদ। ভালই লাগলো রেঙ্গুনে সব ধর্মের মানুষের সহাবস্থান দেখে। প্রথমদিন আমার স্ত্রী যেমন লুঙ্গিওয়াদের দেখে বিস্মিত হয়েছিলেন এখন আমি বিস্মিত হচ্ছি এতো মসজিদ এবং মুসলিম নারী-পুরুষ দেখে। সবাইকে দেখতে পোষাক-আশাকে আমাদের গ্রামের লোকদের মতোই লাগছিল। পুরুষদের পরনে লুঙ্গি-পাঞ্জাবি, মাথায় টুপি, মুখে পান। কি অদ্ভূত মিল কক্সাবাজার অঞ্চলের অধিবাসীদের সঙ্গে। মনে মনে ভাবছি এদেরই কেউ না কেউ হয়তো আমাদের পূর্বপুরুষদের বংশধর।

রাতে নাইন্টিন্থ স্ট্রিটে খাব বলে চিন্তা করে রেখেছি। আমার স্ত্রী ইন্টারনেট ঘেঁটে বের করলেন এই স্ট্রিটে অনেক রাত পর্যন্ত খাবার পাওয়া যায়। তাই সোলে প্যাগোডা থেকে হাঁটতে হাঁটতে সেখানে গেলাম। গিয়ে দেখি ইউরোপিয়ান-আমেরিকানদের পদচারণায় জায়গাটা গিজ গিজ করছে। সবাই এখানে খাচ্ছে ফুটপাথে বসে। আমরাও একটা টেবিল টেনে সী ফুড অর্ডার করে ডিনার সারলাম। রাত ১২টা নাগাদ ফিরলাম হোটেলে।

ফেরার দিন আর দূরে কোথাও গেলাম না। আশেপাশের মার্কেট থেকে কিছু কেনাকাটা সেরে সোজা বেরিয়ে পড়লাম এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে। এয়ারপোর্টের পথে ১০ মিনিটের জন্য টেক্সি দাঁড় করলাম অংসান সুচি’র বাড়ির সামনে। বন্ধ গেটের সামনে কয়টি ছবি তুলে ফের ছুটলাম এয়ারপোর্টের পথে। বিকাল ৫টায় ছিল ব্যাংককের উদ্দেশ্যে আমাদের ফ্লাইট। পরিশিষ্ট : বার্মা বা মিয়ানমার, প্রচীন জনপদে এই দেশটি ঘুরে বেড়াতে অনেক সময় এবং অর্থের প্রয়োজন। শুধুমাত্র ইয়াঙ্গুনের সব দর্শনীয় জায়গা ঘুরে বেড়াতে কমপক্ষে ৭-১০ দিন সময় লাগে। আমাদের সময় স্বল্পতার কারণে সবখানে যেতে পরিনি। পরেরবার যাব আশা রাখছি। ভ্রমণপিয়াসী পাঠকদের বলি, এখন ইয়াঙ্গুন যাওয়া অনেক সহজ। ঢাকা থেকে বাংলাদেশ বিমান এবং নভোএয়ারের ফ্লাইট রয়েছে প্রতি সপ্তাহে। রিটার্ন ভাড়াও কমবেশি ২২-২৫ হাজারের মধ্যে। নভোএয়ার ভিসা প্রসেসিংয়েও সহায়তা করে থাকে। ভিসা প্রতি সম্ভবত সাড়ে ৪ হাজার টাকা ফি নেয়।

তাই একদিন প্ল্যান করে চড়ে বসুন রেঙ্গুনের উদ্দেশ্যে। বেড়িয়ে আসুন অংসান সুচির দেশ মিয়ানমারে।

Please follow and like us:
0

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

CAPTCHA


error: Content is protected !!